"); -->
Showing posts with label Bengali. Show all posts
Showing posts with label Bengali. Show all posts

Oct 1, 2015

পোড়ার… মুখী

|| পোড়ার… মুখী ||


সকাল থেকেই শাশুড়ি-মা, বৌকে  দিচ্ছে ধ্যাতানি,
কাক-পক্ষী উড়ে পালায়, এমন গলার চ্যাঁচানি ।

বৌ বসেছে মাজতে বাসন, কলতলাতে রেখে,
শাশুড়িকে ভেংচি কাটে, এদিক-ওদিক দেখে ।

বৌকে উচিৎ শিক্ষা দিতে, শাশুড়ি যায় ঘেমে,
“লক্ষ্মীছাড়া, পোড়ার ...” , বলেই হটাত গেলো থেমে ।

চমকে উঠে, বৌ তাকালো শাশুড়ি-মায়ের দিকে,
হঠাৎ কেন থামল বুড়ি, সেই খবরটা নিতে ।

সামনে গিয়ে, বললো ডেকে, “কি হয়েছে মা ?”
দেখল আগুন-চোখে চেয়ে বুড়ি, মুখটা করে হাঁ ।

ঘাবড়ে গিয়ে বৌ গিয়ে তার বরকে আনে ডেকে,
বুড়ির ছেলে ঘাবড়ে গেল মায়ের এ হাল দেখে ।

ভ্যান গাড়িতে চাপিয়ে মাকে, ছুটল ডাক্তার বাড়ি,
ডাক্তার বাবু ঘরেই ছিলেন, কিন্তু ব্যস্ত ভারী ।

ছেলে গিয়ে ডাক্তার বাবুর পা জড়িয়ে ধরে,
“ডাক্তার বাবু, কি হোল মা'র, কথা বলবে কেমন করে ?”

ডাক্তার বাবু দেখে বলেন, “আটকে গেছে চোয়াল ।
বাড়ি বসে, উনি কি আজ গাইতে ছিলেন খেয়াল ?”

বৌ বলল, “রোজ সকালে, আমার উপর চেঁচান নিয়ম মেনে,
আজ 'লক্ষ্মীছাড়া, পোড়ার', বলে হঠাৎ গেলেন থেমে ।“

ডাক্তার বাবুর হাতের চাপে চোয়াল গেল খুলে,
শাশুড়ি মা ও উঠে বসলেন “...মুখী” কথাটি বলে ।

(প্রয়াত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় 'বনফুল' এর একটি ছোট গল্প অবলম্বনে আমার এই কবিতা)

------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Kalyan Kumar Basu in WaaS / 01 October 2010

সুপ্রভাতের পান-তামোল

|| সুপ্রভাতের পান-তামোল ||


আজকাল যে কোন ফেসবুক গ্রুপের পাতা খুললেই দেখা যায় কয়েকটা "গুড মর্নিং" পোষ্ট । আমাদের WaaS গ্রুপেও রোজ অন্তত: আট-দশটা ওরকম গুড-মর্নিং পোষ্ট দেখা যায় । কখনও চায়ের কাপ, কখনও সুন্দর ফুলের ছবি, কখনও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, শিশুর ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি । সকালে ফেসবুক খুলে সুন্দর সুন্দর এই পোষ্ট গুলি দেখে অনেকেরই মন ভরে উঠে । কিন্তু আজ অব্দি সাজানো পানের বাটা দিয়ে স্বাগত জানিয়ে কোন গুড মর্নিং পোষ্ট দেখা যায়নি । 

পান আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । যদিও আজকাল অনেকেই পান খাওয়ার থেকে পান করতে বেশী অভ্যস্ত । আবার অনেকে পান করা বা খাওয়ার চেয়ে pun (শব্দ-কৌতুক) করতে বেশী ভালবাসেন । মিল্টন পাল, উমেশ কুমার দুবে এবং উদয়ন দাসগুপ্ত মহাশয়দের pun-যুক্ত সরস ও ক্ষুরধার কমেন্ট প্রায়ই দেখা যায় । অলোক কুমার চ্যাটার্জি, প্রবীর আচার্য এবং ফিলিপ্স বিশ্বাস মহাশয়েরাও pun  এর ব্যাপারে কোন অংশে পিছিয়ে নেই ।

বাড়ীতে কোন অতিথি এলে ওকে বাটাতে পান সাজিয়ে অভ্যর্থনা করা প্রাচীনকাল থেকেই একটা ঐতিহ্যপূর্ণ প্রথা । বিশেষ করে উত্তর ও পূর্ব ভারতে এর প্রচলন বেশী । বারানসির পান তো বিশ্ববিখ্যাত । বৃহস্পতিবারে লক্ষ্মীদেবীকে পান নিবেদন করা হয় । সংগীত, সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থেও পান দিয়ে অভ্যর্থনার / পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় ।

আসামে সুপারিকে তামোল বলা হয় । এটি একটি বিশেষ পদ্ধতিতে সুপারিকে জরিয়ে তৈরি করা হয় এবং বেশ কড়া হয় । খাসিয়ারা পান-সুপারিকে কোয়াই বলে । এটি আরও বেশী কড়া । গতমাসে শিলচর গিয়েছিলাম বিশেষ কাজে । সেখানে পানের খুব প্রচলন । ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা প্রায় সবাই পান খেতে অভ্যস্ত । বাড়ীতে কেউ গেলে প্রথমেই পানের বাটা এগিয়ে দেওয়া হয় । যেহেতু অধিকাংশ লোকই বাঙ্গালী, তাই ওখানে পান খাওয়ার পদ্ধতি আমাদের এখানকার বাঙ্গালীদের মতই ।  

অনেকদিন আগে আমি তখন আসামের ডিব্রুগড়ে পোষ্টেড ছিলাম । ওই সময় অফিসে সুশীল দাস নামে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মী ছিলেন । রোজ অফিসে ঢুকে সই করে একটা পান-তামোল তারিয়ে তারিয়ে চিবিয়ে তারপর উনি কাজে বসতেন ।  ডিপার্টমেন্টে তখন শৈলেন এবং মনোজ নামে দু-জন সাব-স্টাফ ছিল । সুশীল দাস সিটে বসেই ওদের যাকে সামনে পেতেন তাকে গুড মর্নিং অভিবাদন করতেন । তারপর সে (শৈলেন কি মনোজ) সোজা নেমে গিয়ে অফিসের কাছেই একটা বাঁধা ধরা দোকান থেকে দুটো পান-তামোল নিয়ে আসত । একটা সুশীল দাসের জন্য এবং আরেকটা তার নিজের জন্য । ওদেরকে দেখলেই দোকানদারও কোন কথা না বলে দুটো পান প্যাকেট করে দিয়ে দিত । 

একদিন সুশীল দাস অফিসে এসে হাজিরা খাতায় সই করে বসে আছেন তামোল-পানের জন্য । অনেকক্ষণ কেটে গেছে কিন্তু কেউই তামোল-পান আনে নি । একটু পরে উনি শৈলেন নামের ছেলেটিকে ডেকে বলেন, "শৈলেন, আজি মই তোমাক গুড মর্নিং দিয়া নাই নেকি ?" “ওহো ! আপুনি মোক গুড মর্নিং দিছে ঠিকেই, মই একদম পাহরি গলুঁ ।" এই বলে ও তখনই বেরিয়ে গিয়ে দুটো তামোল-পান নিয়ে আসে । 

ওই দিন বুঝলাম, গুড-মর্নিং-এর সাথে পানের অন্য একটা অন্তর্নিহিত সম্পর্ক আছে ।

-------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Shyamal Kumar Das in WaaS / 01 October 2015

Sep 30, 2015

সোমনাথ চক্রবর্তী সংকলন – সেপ্টেম্বর

---------------- সোমনাথ চক্রবর্তী সংকলন – সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ----------------


|| পুজোর গন্ধ ||


পুজো আসছে বলে আকাশের দিকে হা পিত্যেস করে তাকিয়ে আছি । কখন ভাসবে সেই পেঁজা তুলোর হালকা মেঘের ভেলা আর অক্ষয় বাবু আসবেন পুজোর চাঁদা নিতে । অক্ষয় বাবুর বাড়ি নারকোল গাছ আর কলাগাছে ঘেরা ঐ দূর গ্রামের প্রান্তে, আমাদের পৃথিবী থেকে একটু দূরে । যেখানে কদিন বাদে কাশফুল ফুটবে অবহেলায় আর পুকুরে ফুটে থাকবে এক আধটা গোলাপি আভার শালুক, নাকি পদ্ম, কে জানে । সেখানে দশ বারো ঘর গরীব লোকের বাস, নিজেরা চাঁদা তুলে আর পরিচিত জনের কাছে কিছু জোগাড় করে পুজো হয় । তিন ফুটের ছেলেখেলার দুগ্গো ঠাকুর । তবে নিষ্ঠা আর উদ্বেল উচ্ছ্বাস কিন্তু একটুও ছেলেখেলার নয় । সেখানেও ঢাক কাঠি পড়ে, শাঁখ বাজে । নবমীতে হয় খিচুড়ি ভোগ আর দশমীতে সিঁদুর খেলা । হয়তো এলইডি আলো নেই কিন্তু মানুষগুলোর মুখ ওই কটা দিন ঝলমল করে মনের আলোয় । মাইক নেই, পরোয়া নেই, ইচ্ছে হলে নিজেরাই নাচে গায়। সন্ধ্যারতির পর শতরঞ্চিতে বসে হারমনি বাজায় আর প্রাণ খুলে গান করে ।

গতবছর দেখে এসেছি পুজোর পর খুশির রেশটুকু ধরে রাখার জন্যে এক অপরূপ আয়োজন । প্রতিমাসে একদিন যে কোনও একজনের বাড়িতে সন্ধ্যায় বসে চায়ের আসর । হয়তো বা সঙ্গে থাকে মনভুলোনো টা । হৈহৈ করে, গায়ে গা লাগিয়ে, ঠেলেঠুলে ঘুরিয়ে দেয় ওরা বছরের চাকা । পলকা দুঃখগুলো যেন আর পাত্তাই পায় না । 

আবার দেখলাম এ্যাম্বুলেন্স ঢোকার মতো রাস্তা নেই বলে ওরা চাঁদা তুলে কিনে রেখেছে একটা স্ট্রেচার । এবারেও যাবো, একবার গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে আসবো কেমন ওখানে খুশির হাওয়ায় হাওয়ায় আমলকীদের ডালে ডালে নাচন লাগে ।

- ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| প্রাসঙ্গিকি ||


আনন্দের উৎস খুঁজতে গুরুদেবের কাছে বসেছিলাম কাল মাঝরাতে । তখন মনে হলো দুঃখ আর আনন্দ যেন একে অপরের পরিপূরক । দুঃখের শেষে আছে যে আনন্দ, সেই তো আমার পরম পাওয়া । নাহলে সে প্রাপ্তির যে কোনও মর্যাদা থাকে না । পিটুলি গোলাতে তো দুধের স্বাদ মেলে না, মনও ভরে না । রচনাবলীর যে অংশটুকু কাল প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিলো, বহু পঠিত সেই অংশটুকু উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেল না । 

"জগতের প্রাণের মধ্যে গভীর আনন্দ বিরাজ করিতেছে । সে আনন্দ আলোক কিছুতেই আচ্ছন্ন করিতে পারিতেছে না, বরঞ্চ যতকিছু শোকতাপ সেই দীপ্ত আনন্দে বিলীন হইয়া যাইতেছে । শিবের সহিত জগতের তুলনা হয় । অসীম অন্ধকার দিক বসন পরিয়া ভূতনাথ পশুপতি জগত কোটি কোটি ভূত লইয়া অনন্ত তাণ্ডবে উন্মত্ত । কণ্ঠের মধ্যে বিষ পূর্ণ রহিয়াছে, তবু নৃত্য । বিষধর সর্প তাঁহার অঙ্গের ভূষণ হইয়া রহিয়াছে, তবু নৃত্য । মরণের রঙ্গভূমি শ্মশানের মধ্যে তাঁহার বাস, তবু নৃত্য । মৃত্যু স্বরূপিনী কালী তাঁহার বক্ষের ওপর সর্বদা বিচরণ করিতেছেন, তবু তাঁহার আনন্দের বিরাম নাই । যাহার প্রাণের মধ্যে অমৃত ও আনন্দের অনন্ত প্রস্রবণ, এত হলাহল এত অমঙ্গল তিনিই যদি ধারণা করিতে না পারিবেন তবে আর কে পারিবে । সর্পের ফণা হলাহলের নীল দ্যুতি বাহির হইতে দেখিয়া আমরা শিবকে দুঃখী মনে করিতেছি, কিন্তু তাঁহার জটাজালের মধ্যে প্রচ্ছন্ন চিরস্রোত অমৃতনিস্যন্দিনী পূণ্যভাগিরথীর আনন্দ কল্লোল কি শুনা যাইতেছে না ? নিজের ডমরুধ্বনিতে, নিজের অস্ফুট হর্ষগানে উন্মত্ত হইয়া নিজে যে অবিশ্রাম নৃত্য করিতেছেন, তাহার গভীর কারণ কি দেখিতে পাইতেছি ?

বাহিরের লোকে তাঁহাকে দরিদ্র বলিয়া মনে করে বটে, কিন্তু তাঁহার গৃহের মধ্যে দেখো দেখি, অন্নপূর্ণা চিরদিন অধিষ্ঠান করিতেছেন । আর ঐ যে মলিনতা দেখিতেছ, শ্মশানের ভস্ম দেখিতেছ, মৃত্যুর চিহ্ন দেখিতেছ, ও কেবল উপরে, ঐ শ্মশানভষ্মের মধ্যে আচ্ছন্ন রজতগিরিনিভ চারুচন্দ্রাবতংস অতি সুন্দর অমর বপু দেখিতেছি নাকি ? উনি যে মৃত্যুঞ্জয় !"

- ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| অতিথি ||


বাক্স দেখেই ভিরমি খাচ্চো মিথ্যে তোমার ভয়
তোমার বাড়ি থাকবো দুদিন তার বেশি তো নয়,
ব্যাংকে করি ম্যানেজারি এইতো পরিচয়
বাড়ির পাশেই গঙ্গা দেখছি কুলকুলিয়ে বয় !

নদীর ধারে একলাটি আজ বসবো গভীর রাতে
ঘুমিয়ে পোড়ো বন্ধু তুমি নাইবা গেলে সাথে,
খাবারদাবার সঙ্গে আছে চিন্তা কিছুই নাই
তরল পথে চলবো রাতে জমবে পুরোটাই ।

একটু বেলায় উঠতে পারো কালকে যে রোববার,
খালি হাতেই ফিরতে হবে মনটা পরিষ্কার !

- ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| চলো একদিন ||


ভোরবেলায় ধর্মতলা থেকে ছ্যাকড়াগাড়িতে চলো যাই
পাঁচ ঘন্টায় হটুগঞ্জের হাট ।
খোড়ো চালের চা দোকান, বাঁশপোতা বেঞ্চি
কাঁচের গেলাসে কালচে চা, আঃ...
সাথে থাক লেড়ো বিস্কুট ।
তারপর সারাদিন টোটো কোম্পানি,
থালায় ঢালা মুড়ি, ঘুগনিতে ভয় ? তবে থাক
যদি মুড়িতে নাও কয়েকটা বাতাসা, খাসা !
বিড়ি চলবে ? উল্টোদিকে ফুঁ মারো নয়তো কানে গোঁজো ।

দেখো না কেমন টাটকা সবজি, রকমারি পাখি, 
ডুরেশাড়ি আর টাটকা মানুষ,
যতো দেখবে দুচোখ জুড়োবে, শান্তির জল বৃষ্টিধারার মতো
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে তোমার গায়ে মাথায় ।

মুখোশ হীন বন্ধু পাবে । রোদে পোড়া ক্লান্তিটুকু ধুইয়ে দেবে
কালো দীঘির জল । 
মাটির দাবায় বসে ঠিক দুপুরে, চলবে নাকি পান্তা ?
প্যাঁজ পাবে না, আছে ফুরুলি আর নঙ্কা, 
আর আছে পেট ভর্তি কচি ডাবের জল ।
দিনের শেষে ফিরতি বাসে জানলা দখল ।

এক বন্ধু 'বাবু ', বললে যাবো না,
এসি গাড়িতে ফিষ্টি করবো
মানুষ দেখবো না ।

- ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

।। দিবারাত্রির কাব্য ।।


সকালে বাজার যাওয়া হয়নি কো নানা কাজে আজ
মাছ নেই হাসি নেই অন্ধকার ডাইনিং হল, 
বিকেলে ভাবছি তাই আনতে হবে চিকেন লালিপপ
ঝুমঝুমি হাতে দিয়ে করতে হবে মনটা দখল ।

পকেটের কোণে থাকবে সাবধানে দুটো জেলুসিল
টিভিতে চলবে সুখে সাতরঙা মেগা সিরিয়াল,
এভাবে ঠেকায় সুরে কবিতায় খোঁজা অন্ত্যমিল
বেলঘরিয়াতে যাবে পানসি শুধু ধরে থাকবো হাল ।

যে 'কদিন পাশাপাশি থাকা যায় ভালোবাসা যায়
ঠেকাজোড়া দিয়ে আছি ফাঁক পেলে ভরে দিচ্ছি প্রেম, 
দানাপানি উল্টে ফেলে তুমি ডাকলে ওমনি ফুড়ুৎ
শেষ হবে একঘেয়ে লুডো খেলা জীবনের গেম !

- ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| কিছু কথা কিছু ব্যথা ||


পোস্ট আর কমেন্ট দিয়ে বন্ধুদের মনের খুব কাছাকাছি যতো তাড়াতাড়ি আসতে পারা যায়, এমনটি বোধহয় আর কিছুতে নয় । লাইক তো দূরেই থাকে, তার সাথে তেমন লেনাদেনা হয় না । ধরুন কোনও বন্ধুর সাথে হঠাৎ রাস্তায় দেখা হলো । দুজনেই খুব খুশি, প্রাণে খুশির তুফান উঠলো । অনর্গল কথা, গল্প যার বেশির ভাগটাই ভিড়ে হারিয়ে যায় । দমকা হাওয়া এসে উড়িয়ে নিয়ে যায় । চলে যাবার পর খুব মনে হয়, অনেক কথাই যে বলার ছিলো । যেগুলো বলা হয়ে উঠলো না ।

কিন্তু হাতে লেখা দু একটি শব্দ অদ্ভুত কায়দায় মনের ভেতর ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়ে, নিজের জায়গা করে নেয়। তার দাবি যেন অনেক বেশি । আমাদের পুরোনো দিনগুলো তো এমনই ছিলো । হলুদ হয়ে যাওয়া কতো চিঠি আমরা বারবার আলতো হাতে খুলে পড়েছি, এখনো পড়ি । মানুষটাকে তখন বুকের বড়ো কাছাকাছি পাই । কাছে না থাকলেও তার জামার গন্ধ নাকে এসে লাগে । আমরা পুলকিত হই !

- ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| চয়নিকা ||


সমরেশ মজুমদার আমার প্রিয় সাহিত্যিক । তাঁর গল্পে উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ দাশকে চলে ফিরে বেড়াতে দেখেছি । তাঁর একটি সাম্প্রতিক উপন্যাসে ব্যবহৃত কবি সংহিতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন দিয়ে আজ WaaS এর পাতা সাজালাম ।

ঠাকুরঘর ঠাকুরঘর
বুকের ভেতর ঠাকুরঘর, 
আসতে যেতে দুটো সাঁকো
জোড়া দিলেই ঠাকুরঘর ।

ঠাকুরঘরে যেতে আসতে দুটো সাঁকো কেন ? বলুন না, মনের কথা মুখে বলুন । দুটো সাঁকো জোড়া দেওয়ার ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না । সহজ বলেই কঠিন লাগছে । ধরুন দুটো দিঘি পাশাপাশি, দুটো বলদ একসঙ্গে । কি বলবেন তাদের ? জোড়া দীঘি, জোড়া বলদ । আরে কি কাণ্ড ! এতো সাধারণ মেয়ে নয় ! সাধারণ কবি নয় ||

সংগ্রহ / কৃতজ্ঞতা / কবি সংহিতা চট্টোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার ।

- ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

।। কিছু কথা কিছু ব্যথা ।।


মস্তিষ্ক আর হৃদয় । আমাদের শরীরের দুটি যন্ত্রবিশেষ । সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এই যন্ত্র দুটি মানুষ ছাড়া অন্য কোনও জীবের শরীরে নেই । মস্তিষ্ক হলো জ্ঞান ও মেধার উৎপত্তিস্থল আর হৃদয়ের কমলবনে তো আছে শুধুই প্রেম । মস্তিষ্কে পেশীশক্তির জয়জয়কার । সে শারীরিক অস্তিত্বে বিশ্বাসী যা নিয়ত ক্ষয়শীল । আজ যা নতুন আগামীকাল তা পুরোনো । দিনের ভারে বয়সের চাপে জ্ঞান একসময় বৃদ্ধ হয় কিন্তু হৃদয়ের কথা চিরকালীন আর চিরনবীন, শুধু একান্ত অনুভবের, কখনো পুরোনো হয় না । অশীতিপর দন্তহীন বৃদ্ধের কণ্ঠে প্রেমসংগীত কখনো বেমানান নয় কিন্তু ঐ বৃদ্ধ বয়সের অর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার বর্তমানের নিরিখে অচল হয়ে পড়ে । একই শরীরে এই দুই অঙ্গ ঈশ্বর দিয়েছেন, তাই তো আমরা ঘুরেফিরে বেড়াই আনন্দে আর শান্তিতে ।

তেমনি যদি কারও দুটি সন্তান থাকে, একজন মেধাবী, দুরে থাকে । অন্যজন অপেক্ষাকৃত কম মেধার, যে বৃদ্ধ বয়সে বাবা মাকে আগলে রাখে নিজের সন্তানের মতো তাহলে আর সংসারের ছন্দপতন হয় না । কিন্তু যার একমাত্র সন্তান প্রবাসী কিংবা বিবাহসূত্রে ভিনদেশি, বয়স যাদের শারীরিক ক্ষমতা দিনে দিনে কেড়ে নিলেও বুকের রুধির নিংড়ে যাদের এখনো হাসতে হয়, তাদের কি হবে ? মস্তিষ্ক যদি অলস হয় তবু চলে কিন্তু বুকের বাঁদিক অলস হলে তো চলবে না একটুও । তাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দেখা যায় । এ বয়সে নিঃশর্ত সমর্পণের ভঙ্গি ফুটে ওঠে আমাদেরও দেহে মনে । সমস্ত প্রাণটাকে মুঠোর মধ্যে জড়ো করে এনে তাঁর পায়ে থোবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয় প্রতিদিন প্রতি অনুপল ।

"তোমারি মিলনশয্যা, হে মোর রাজন,
ক্ষুদ্র এ আমার মাঝে অনন্ত আসন
অসীম, বিচিত্র, কান্ত। ওগো বিশ্বভূপ,
দেহে মনে প্রাণে আমি একি অপরূপ ।"

- ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| জলখাবার ||


সকালবেলায় শুনি জলখাবারটা আজ বাইরে খেয়ে নাও ।
ওমনি বুকের মধ্যে গুরগুর করে ছটফটিয়ে উঠলো
খুশির মেঘ, আকাশকে মনে হলো
আরেকটু বেশি বেশি নীল,
পালতোলা মেঘগুলোকে ডেকে বল্লাম
ওগো, একটু দাঁড়াও আমি আসছি ।
চশমাটা পরে নিয়ে, কমল মিত্রর মতো গোমড়া মুখে
আমার বাজখাঁই গলা শুনলাম
বাজারের ব্যাগটা দাও ।

বাইরে বেরিয়ে মনটা প্রজাপতির পাখায় ফুরফুরিয়ে উঠলো,
পাড়ার মাঠে বাঁশ পড়েছে প্যান্ডেলের 
কিশোরীর হাসির মতো মিষ্টি রোদ নেমেছে তেরচা হয়ে
পুকুরের জলে ।

আজ খুব মজা, 
শালপাতার বাটিতে রসগোল্লার মতো গোল খাস্তা কচুরি
দু-দুটো, হাতে গরম ভেতরে খয়েরি পুর, সাথে টকমিষ্টি চাটনি ।
এরসাথে আজ মানিয়ে গেলো
শিউলি ফুলের মতো দুধ-সাদা রূপসী সীতাভোগ,
তার ভেতর নিখুঁতি দিয়ে নিখুঁত সাজানো, তারপর আর কি
বাজারে সঙ্গে গেলো পদ্য
ছুটি নিয়ে বাড়ি গেলো গদ্য ।

- ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------


|| কল্যাণদা কে ||

You have played your innings !

তোমার কথায় এখন হারাধনের সেই দশটি ছেলের কথা মনে আসছে 
কিংবা ধরো আমাদের এগারো জনের ক্রিকেট টিম,
সারা মাঠ জুড়ে থৈথৈ দর্শক
ঘাসে ছড়ানো শীতকালীন ভালোলাগা নরম রোদ,
সুন্দরীর চোখে সানগ্লাস হাতে পেলব কমলালেবু
আমরা সবাই ইউনিফর্ম পরে প্যাভিলিয়নে ।

ক্রিজে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা অনুপম মারকাটারি ছক্কা হাঁকাচ্ছো
হাততালির দুরন্ত ঝড়ে থরোথরো কাঁপছি আমরা,
গ্যালারিতে ফেটে পড়ছে দুরন্ত উল্লাস ।

হঠাৎ দেখি তোমার ইনিংস শেষ ।
শত রানের হিরের মুকুট মাথায় নিয়ে স্বর্গীয় হাসিমুখে
ব্যাট হাতে ফিরে আসছো বা ফিরে যাচ্ছো
কোথায় কে জানে,
পরের জন ক্রিজে !

- ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| দিনের কবিতা ||


ধরিত্রী ও নদীর মতোন তবে
কবিতাও সেই প্রিয় নারী,
সৃষ্টি করে রক্ষা করে তৃষ্ণা করে দূর
মুক্তো হেসে সুক্তো রাঁধে ভরসা ভরপুর ।

আঁচল বিছিয়ে দিলে রৌদ্রদগ্ধ দিনে
প্রিয়পদ যত্নে রাঁধো বাঁধো মুক্ত চুল,
কপালে কুমকুমে আঁকো যত্নে ঘন টিপ
ভালোবাসা ঢেলে দিচ্ছো করছো না তো ভুল ।

কখনো বা দশভুজা নীলকণ্ঠ প্রিয়া
অসুরদলনে রত রক্ষাকর্ত্রী তুমি,
করতলে তুলে নিচ্ছো পৃথিবীর দায়
বাসযোগ্য করে তুলছো প্রিয় জন্মভূমি ।

শ্যাম্পু করা চুল উড়ছে বসন্ত বাতাসে
একটি কন্যার মূল্য অপার অসীম,
পুরুষের ক্লান্তি মোছে শুশ্রূষার হাত
বন্ধ করো ভ্রূণহত্যা মুক্ত করো দিন ।

- ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| কিছু কথা কিছু ব্যথা ||


নতুন বাড়িতে টেলিফোন আসেনি তখনো অথচ বাইরে পোস্টিং । ছেলে তখন খুব ছোট, সে আর তার মা একা থাকতো । সন্ধ্যাবেলা অফিস ছুটির পর বন্ধুর বাড়িতে আমার এসটিডি কল ধরতে গিয়ে কুকুরের চিৎকারে ভয়ে কুঁকড়ে যেত আমার ছেলে ।

গতকাল স্কাইপে তাকে পেলাম । অনেকক্ষণ গল্পগাছা করা গেল । ও মাঝে মাঝে বিদেশে থাকাকালীনও স্কাইপে যোগাযোগ করা গেছে । যাই হোক, রাত দশটার পর হঠাৎ খেয়াল হলো টাকা তুলতে ভুলে গেছি । দু'পা দূরে এটিএম, চটিটা পায়ে গলিয়ে ঘুরে এলাম । এমনিতর বিশ্বায়নের হাওয়া লেগেছে আমাদের রাজ্যেও । শহরে গ্রামে গঞ্জে । খুশি মনে রাতের খাবার মুখে তুলতে গিয়ে থমকে গেলাম টিভির খবরে । বাড়িতে বললো দুপুরবেলা প্রচারিত রান্নাঘর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ডাক্তাররা বলেছেন আজকাল এগারো বারো ক্লাসের স্কুল বালিকারাও নাকি যথেচ্ছ ব্যবহার করছে ওসি পিল । এও কি তবে ঐ দামাল হাওয়াতেই উড়ে আসা জঞ্জাল ?

খাবারটা মুখে ঠিক রুচলো না আর । চোখের পাতা ভিজে উঠলো আবার। মনে হলো কোথায় হারিয়ে গেল সেই নানা রঙের দিনগুলি !

- ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| শনিবারের বিকেল ||


বাসের জানলায় বসে আছে এক অপরূপা সুন্দরী । তার প্রতিমার মতো মুখ, একঢাল চুল, কমলা রঙের উজ্জ্বল চুড়িদার, নম্র নত চোখ আর ধনুক টানা ভুরু দেখে পেছনের সিটে বসা অমল বাবুর মনে হলো এমন একটি মেয়েকে তাঁর ছেলের বৌ হিসেবে খুব ভালো মানায় । অমল বাবুর রিটায়ারমেন্টের আর মাত্র কয়েকমাস বাকি। একমাত্র ছেলে বছর পাঁচেক হলো চাকরি করছে সরকারি ব্যাংকে ।

এমন মেয়ে পেলে নেতানো ঝিমানো ঘরদোর পলকে আবার চনমনে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠবে । কিন্তু কি করে ? অপরিচিতাকে কিছু জিজ্ঞাসা করাও তো মোটেই সমীচীন নয় আজকালকার দিনে । ওর সঙ্গে নেমে গিয়ে দেখে আসবেন ওর ঘরবাড়ি ? কিন্তু ও কোথায় যাচ্ছে, কেই বা তা জানে । এইসব সাতপাঁচ ভাবনার মধ্যে কন্ডাক্টর এসে টিকিট চাইলে মেয়েটির কাছে ।

লেডিজ ব্যাগ থেকে পয়সা বার করে টিকিট দিলো মেয়েটি আর তখুনি বেজে উঠলো তার ব্যাগের মধ্যে মোবাইল ফোন । বার করে বললো, আমি এখন খেতে বসেছি, পরে ফোন কোরো । অমল বাবু অবাক, বাসের সিটে বসে ফোনে বলছে খেতে বসেছি, আশ্চর্য ! একটু বাদে আবার ফোন। এবার বোধহয় মেয়েটির মা । কোচিং ক্লাসে আজকে মক টেস্ট হচ্ছে, বিরক্ত কোরো না এখন । কোথায় কোচিং ক্লাস আর কোথায় মক টেস্ট । অমল বাবু থ । লেডিজ সিটে পার্শ্ববর্তিনী বয়স্কা মহিলার ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি । কখনো বা তাঁর চকিত মুখে থমকে থামছে আর ভেসে যাচ্ছে আশঙ্কার কালো মেঘ । এমন মেয়ে তাঁর ঘরেও আছে কিনা কে জানে । জানলার হাওয়া মেয়েটিকে পেরিয়ে এসে উড়িয়ে দিচ্ছে মহিলার কাঁচাপাকা চুল ।

এবার নিজেই ফোন করলো মেয়েটি বোধহয় কোনও বন্ধুকে । একথা সেকথার পর, আমি এখন গড়িয়াহাটে বাটার দোকানে জুতো কিনছি । তোর সঙ্গে পরে কথা বলবো । বাস তখন পেরোচ্ছে বৌবাজার । এমন হবে ছেলের বৌ ? মিথ্যের পাহাড় ।

মুহূর্তে অমল বাবুর মন সম্পূর্ণ বিরূপ হয়ে গেলো । মেয়েটির কোমল সুচারু মুখশ্রী, আনত নয়ন, কোলকাতার ঝলমলে দুপুরে চলন্ত বাসে সেই গ্রেসফুল এ্যাপিয়ারেন্স তাঁর কাছে এখন মূল্যহীন ফালতু বলে মনে হলো । মনে মনে বললেন, না, আমার একমাত্র ছেলের জীবন মিথ্যে দিয়ে শুরু হোক, এ আমি চাই না ।

নির্দিষ্ট স্টপেজ আসার আগেই অমল বাবু বাস থেকে নেমে খোলা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন । কাল রোববার, গিন্নিকে নিয়ে চৌধুরী বাবুর মেয়েকে নাহয় একবার দেখে আসবেন । চাওলার কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে নিলেন টলটলে ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড় ।

- ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| আজকের সেরা খবর ||


"উন্নত দুনিয়ায় কলের মিস্ত্রি আসেন গাড়ি হাঁকিয়ে । সেখানে এ দেশে আজীবন স্যুট বানানো দর্জি অভাবের কারণে তা গায়েই দেননি কখনো । তাহলে হাত তুললে কোথায় টান পড়বে, তিনি তা বুঝবেন কি ভাবে ? "

মাইন্ড ট্রির ফাউন্ডার আজ বলেছেন দর্জির গায়ে কোট না উঠলে কিকরে বুঝবে সে হাত তুললে কোথায় পড়ছে টান । আমিও তো তাই চাই তার হাভাতে পেটের টান ছুঁচের পেছনে সুতো দিতে দিতে ক্ষয়ে যাওয়া পলকা প্রাণ, ছানি পড়া ঝাপসা চোখে ডাঁটি ভাঙা চশমা, কুঁজো পিঠ সোজা করে একবার সে সটান উঠে দাঁড়াক ।

একদিন তারও গায়ে উঠুক রেমন্ডস এর থ্রি-পিস স্যুট আমি তখন ঠিক আমার বাগানে ফোটা সেরা গোলাপ কুঁড়ি ভালোবেসে গেঁথে দেব তার বাটন হোলে ।

- ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| রোজনামচা ||


একবছর ধরে সমানে লিখে লিখে বন্ধুদের বুকের ভেতর
সাড়ে তিন হাত জমির দখল পেয়েছি
দ্যাখো পূর্বদিকে,
বন্ধুরা জানে ওখানে আমি সবজির চাষ করবো
নাকি গন্ধরাজ ফুলের, 
আমি জানি না ।

আমার লেখায় ওরা চিনে ফেলেছে আমার ঘর গেরস্থালী
হাঁড়িপাতিল আর রোজনামচার গল্পগাছা,
আমার ভাবনা, অনর্গল কথামালা আর বিদ্যের দৌড়,
আমি এসব কিছুই জানি না ।

শুধু জানি লিখতে লিখতে
একদিন চিৎপটাং শুয়ে পড়বো ঐ সাড়ে তিন হাতে
তারপরে নিশিরাতে মুখে বুকে ঝরে পড়বে হিম শিশির, 
ভোরের নীলাকাশ দিগন্তে ফোটাবে
কমলালেবুর মতো মিষ্টি নরম সূর্য
তোমার ঐ কদম গাছের মগডালে বসে তখন 
যতোই ডাকুক ভোরের কোকিল,
আমি আর উঠবো না ।

- ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| মনে মনে ||


আমাদের এই মন যেন ছোটো জিনিসকে বড়ো করে দেখানোর জন্যে তৈরি এক যন্ত্রবিশেষ । দূরত্ব বাড়লে এই যন্ত্রের কাজ আপনি শুরু হয়ে যায় । এতটুকু আমাদের এই শহর, কিন্তু একে ছেড়ে যাও দেখি একবার কোথাও । পৃথিবীর সুন্দরতম দেশে বসেও তখন তোমার মনজুড়ে ভাসবে হাওড়া ব্রিজ থেকে নেতাজী মূর্তি । পুজোর ঢাকের কাঠি বুকের তলায় বেদনার বাদ্যি বাজাবে । এতটুকু এই শহর তোমার সারা মন জুড়ে বিশাল শরীর বিছিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকবে ।

কিংবা তোমার সন্তান বাড়ি ছেড়ে দেশান্তরে গেলেও দেখবে পাঁচতলা বাড়ির প্রতিটি ঘর বারান্দা জুড়ে সারাদিন সারারাত ভেসে বেড়াচ্ছে তার শরীরের মিষ্টি মধুর গন্ধ । যখন বিছানার চাদর তোলো বা আলমারির দরজা খোলো তখন নাকে চোখে মুখে তার উপস্থিতির মৃদু পরশ লাগে । ফেলে যাওয়া গিটারের ধুলোপড়া তার আর কম্পিউটারের কীবোর্ড আলতো আঙুলে ছুঁলে তার হাতের স্পর্শ সবসময় তুমি পাও । তোমার সারা বাড়ি জুড়ে ঝলমল করে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি । ওই তিন হাজার স্কয়ারফিট বাড়ির প্রতি ইঞ্চি ফ্লোর স্পেস জুড়ে থাকে একটি মাত্র মানুষ, তোমার সন্তান ।

নবজাতকের মামার বাড়ি যাওয়ার কথাটাই ধরো । তখন ঐ দোলায় শোয়া একফোঁটা মানুষ, সারা বাড়ি জুড়ে তার হিসি করা কাঁথাকানির গন্ধ, দুধের গন্ধ, তার স্বর্গীয় হাসির স্মৃতি তোমাকে যেন পাগল করে দেয়। আঙুল ছুঁইয়ে দোলাটা দুলিয়ে দিলে সারা বাড়ি যেন দোদুল দোলায় দুলতে থাকে । তার কান্না হাসির মিঠে আওয়াজ তোমাদের যেন পাগল করে তোলে । নিশিপাওয়া উন্মাদের মতো ছুটে যাও মামাবাড়িতে আর কাঁথায় মুড়ে আদরে ফিরিয়ে আনো সেই একরত্তি প্রাণ ।

প্রাণের মানুষ এরকমই প্রাণ জুড়ে থাকে । বিরাট বিশাল অন্তহীন। দূরে গেলে অন্তরে বুঝি, কাছে থাকলে টের পাই না । তবু মণিমুক্তা আগলে রেখে বাঁচা যায় না। মুঠো খুলে যায়, রত্নগুলো আঙুলের ফাঁক দিয়ে মেঝেয় পড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় । কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে ভরা যায় না ।

- ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| আগমনী ||


"তিনটি দিনেতে কহলো তারা কুন্তলে
এ দীর্ঘ বিরহ জ্বালা এ মন জুড়াবে ।"
----------------------------------

অদ্রিজার আগমনে আকুল আকাশ
শিউলি ফুটেছে তাই রূপে গন্ধভারে
শরতে শিশিরবিন্দু হেসে উঠলো সুখে
ভোরের রোদ্দুর এসে ভালোবাসছে তারে ।

গণপতি চুপিচুপি মাকে ডেকে কয়
শুধু মোটে তিনটে দিন আরও কেন নয় ?
ময়ূরবাহন যিনি তারও ভারি রাগ
স্কাইপে মেলে না তার প্রেমের আস্বাদ ।

মামাবাড়ি থাকতে পারলে আর কিছু না চাই
বাতানুকূল মেট্রো চড়বো তুলনা তার নাই
আইফোনে সেলফি তোলো মাঞ্জা দিয়ে ঘোরো
আনন্দের পেয়ালাটি যতো ইচ্ছে ভরো ।

সরস্বতী সহমত কার্তিকের সাথে
ডোভার লেনে যেতে চান বীণা নিয়ে হাতে
হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা ইতিউতি চায়
মুখশ্রীটা দেখে সবে হেসে মরে যায় ।

লক্ষ্মী বলে আমি থাকি গৃহস্থের ঘরে
প্রতি সন্ধ্যা পুজো পাই ঘট নাহি নড়ে
চির সখা নারায়ণ সাথে মোর তাই
এ ব্যাপারে মোর জন্য চিন্তা কিছু নাই ।

মহেশ শুনিয়া রেগে উমা পানে কয়
তিনটি দিনের বেশি একটি পল ও নয়
দুয়ারে বসিয়া রবো মুহূর্ত গুনিয়া
যেতে হবে ঘরে, গেলে নবমী চলিয়া ।

মহাসুখে কলকে তে মেরে দীর্ঘ টান
কৈলাসেতে পৌঁছে যাবো শান্ত হবে প্রাণ
নবমীর নিশিরাতে সিদ্দির মালাই
গোটাকয় খেয়ে নেব যদি দেখতে পাই ।

দেরি করে বাড়ি যেতে মোটেও না চাই
নন্দীভৃঙ্গী থাকবে সাথে চিন্তা কিছুই নাই ।

- ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

|| রঙ ওঠা রবিবার ||


আবার একটা সাদামাটা রবিবার এলো আজ । বারের হিসেব আর মনেই থাকেনা । শনিবারের রাত ছিলো তখন রামধনু রঙিন - গেলাসে গোলাপি মদের মতো - কবির ভাষায়, 'with beaded bubbles winking at the brim and purple stained mouth' ।  রবিবারের ভোরের আলো জানলার ফাঁকে উঁকি দিলে আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে শোওয়া । যেন কোনও এক সম্রাটের যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিধ্বস্ত বিছানায় বিজয়ী রণ ক্লান্ত শরীরে সুখের মধুর আলসেমি । কেজো সোমবার ছিলো বলেই না রবিবারের এতো রূপ আর উজ্জ্বলতা ছিলো তখন ।

আজ একটু বাদেই উঠতে হবে ছুটতে হবে বাজার । সেই একঘেয়ে কাটা মাছের দরাদরি, আর ভাল্লাগে না ।মটকা মেরে ঘাড় গুঁজে শুয়ে শুয়ে শুনছি আজ দোরে এসেছে মাছওয়ালা । কেনা হচ্ছে ভাঙন মাছ, বাঃ । তাহলে তো ঝোল নয়, ডালনা বা কালিয়া হবে আজ । হালকা খুশির শিরশিরানি গায়ে মেখে ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলুম । যাক, তবু ভালো, ছেঁড়া জালে যা আসে !

- ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫
----------------------------------------------------------------------

।। খোলা চোখে ।।


আজকাল চলচ্চিত্রে ও সিরিয়ালে তথাকথিত স্বামী -স্ত্রী র মধ্যে 'তুই ' সম্বোধনের বেশ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছে । কালে কালে কতোই দেখিব । আমাদের সময়ে তো এই ডাক অশিক্ষিত নিম্নশ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো । যেহেতু সাহিত্য শিল্প এবং চলচ্চিত্র সমাজের দর্পণ তাই বর্তমানে সমাজেও এইরূপ সম্বোধন চালু হইয়া গিয়াছে বলিয়া আশঙ্কা হয় । 

বাস্তবে দেখা যায় পড়ুয়ারা নিজেদের মধ্যে এইপ্রকার 'তুই ' সম্বোধন করে বটে কিন্তু বিবাহযোগ্য বয়স হইয়া থাকিলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাহাদের করতলগত হয় নাই । তবে একত্র বসবাস করিবার ও প্রিয় সম্বোধনে ডাক দিবার স্বাধীনতাটুকু কেউ হরণ করিতে পারে না । সুতরাং বিবাহ নামক প্রাচীন গ্রন্থিটির প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ কমিতেছে । পশ্চিমি সভ্যতার যে বিষবৃক্ষটি একদা যত্নে রোপণ করা হইয়াছিল বর্তমান যুবসম্প্রদায় তাহার সুমিষ্ট ফলটি ভোগ করিতেছে ।

আমরা বৃদ্ধের দল ফুচকা ও আলু কাবলির লোভ অতিকষ্টে সংবরণ করিয়া তৃষিত চাতক পাখির মতো গৃহিণীর হাতের সুরভিত চায়ের পেয়ালার অপেক্ষায় যথাসম্ভব দ্রুত পায়ে সান্ধ্য ভ্রমণ সারিয়া নিজ নিজ ঘরে ফিরিতেছি ।

- ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫

-------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Somnath Chakraborty in WaaS / September 2015

সুবীর কুমার দাস সংকলন - সেপ্টেম্বর

------------------- সুবীর কুমার দাস সংকলন - সেপ্টেম্বর, ২০১৫ -------------------



।। জাতিস্মর ।। 


গতকাল হঠাৎই আমাকে দেখা দিয়ে গেল আমার
গতজন্মের চেহারা 
দেখে কি বলব তোমায় আমি তো বিস্ময়ে হাঁ—
মুখ দিয়ে বাক্য সরছে না
অপমানে, লজ্জায়, ঘৃণায়, নিজেকে দেখছি আর
মিশে যাচ্ছি মাটিতে, ঠিক
মাটিতেও নয়, তারও নীচে কবরখানায়
এক হাঁটু কাদাজলে
আমারই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে আমার
গতজন্মের চেহারা --
হাতে রক্ত, চোখে লম্পটের হাসি, মুখে বদ মদগন্ধ
আপাদমস্তক নীচ ...
তবু সরাসরি চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল
তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে :
নিজেকে খুব ভদ্র আর সৎ ভাবো তাই না ?
তোমার মতো ভালোমানুষ আর কেউ নেই, তাই তো ?
বলেই ছুঁড়ে দিল একতাড়া কাগজের গোছা, বলল
তবে এই নাও তোমার সম্পত্তির জাল দলিল 
দেখো তোমার বাড়ীটাকে চিনতে পারো কী না
ভাইপোকে ফাঁসিয়েছিলে, নকল সই
মনে পড়ে ?
আর প্রথম স্ত্রীর গয়নাগুলো
এখনো যা লুকিয়ে রেখেছ ব্যাঙ্কের লকারে
মেয়ে জানে ?

আতঙ্কে শরীরের সমস্ত রক্ত নিমেষে সাদা, 
ফ্যাকাশে ফতুর—
- আর কি কি জানে ও ?
ভয়ে, জন্ডিসের ঘোলা চোখে দেখি নিজের চেহারা 
সত্যি মিথ্যের মায়াজালে এ জন্মের নিষ্ফল চেষ্টাগুলো
একে অপরকে জড়িয়ে ধরে
যেন জেনে গেছে কেন ব্যর্থ তারা
অবিশ্বাসের চোখে তাকায় আমার দিকে
আমিও লজ্জায়, ঘৃণায়, নিজেকে দেখি আর
মিশে যাই মাটিতে, ঠিক
মাটিতেও নয়, তারও নীচে 
পাতালে, কবরখানায় … ||

০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
---------------------------------------------------------------------------------

।। স্যালাইন ।। 

বহুদিন এমন হয়েছে
বুকের একদম কাছে এসে বসেছে 
আত্মহত্যা
সাপ-লুডো খেলার মতো খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে 
দেখেছে আমাকে 
আসলে দেখতে চেয়েছে আমার চালে 
কি পড়ে 
ছয় না পুট 

এছাড়াও বহুদিন 
গায়ের গন্ধ শুঁকে সাপের মতো লিকলিকে জিভ দিয়ে
চাটতে শুরু করেছে
বিষের বড়ি, আর
হাওড়া ব্রিজের ওপর
সাঁতার জানিনা বলে জলের সে কী ভীষণ 
লাস্যময়ী হাসি …

বহুদিন স্বপ্নের মধ্যে সত্যি সত্যি 
হারিয়ে ফেলেছি আমি নিজের বাড়ী
উঠোন বারান্দা সব ফাঁকা, কোনোখানে 
কেউ নেই
দমবন্ধ একা শুয়ে আছি আমি আমারই কাছে
ছায়া-ছবির নীল শরীর …

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
---------------------------------------------------------------------------------

।। পরিচয় ।। 


শুধুমাত্র সম্ভাষণে থেকে গেল
ভাইও ঔর বহেনো

ভাগ বাঁটোয়ারা জানে এ শুধু কথার কথা
শুধুই অংশীদারি 
সবটা সাজানো !

বাবার মৃত্যু সাক্ষী সম্পত্তির কিস্সায়
মার মৃত্যু জানে সে কেমন
সোনার কাহিনী 

ভাইফোঁটার চন্দনে কেন নেই কাঁটামুক্ত মসৃণতা
রাখীবন্ধনের উৎসবে কেন শুধু ছেলে-খেলা গন্ধ
শুধুমাত্র সম্ভাষণে থেকে গেল
ভাইও ঔর বহেনো !

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫
---------------------------------------------------------------------------------

|| মিলেমিশে একাকার ||


কিছু কিছু কথার মধ্যে ভারি মিল, ভারি বন্ধুত্ব । একদম গলাগলি । পাশাপাশি দেখলেই বোঝা যায় সখ্যতা কাকে বলে । যেমন ‘সাহিত্যের সাত সতেরো’ । কিংবা ‘কবিতার কলা কৌশল’ । ভিতরে বিষয়ের গভীরতা থাক বা না থাক ওপরে মিলজুল আছে । ঠিক একইরকম কিছু কিছু নামের মধ্যেও দেখা যায় ভারি মিল । যেমন, সদাশিব সরকার, সিদ্ধেশ্বর সেন, উৎপল উপাধ্যায়, বরুণ বড়াল ইত্যাদি নানারকম । যেন সা-সা গা-গা মা-মা ....প্রায় গানের মতো, সুরেলা । তবে ইদানীং একটু বদলও হয়েছে । এখন পল্টু হয়ে গেছে পল্টন, কিংশুক শুধুই কিং .....রাজা ! যেন হঠাৎ করে বালি হয়ে গেছে বিলেত ! তবে পদবি তে সেই মান্ধাতার আমলই, চলছে যদিও জোড় লেগেছে । সেন-বরাট, বসু-মজুমদার, দত্ত-ধাড়া । ভাবখানা এই, আমি আমাকে ছাড়ছি না, তুমি এলে আসতে পারো । 

তবে মিলমিশ থাকলেই হলো, সেটাই সব । ইদানীং যার বড় অভাব । আগে মিল ছিল এখন নেই । জুট-মিল নেই, কটন-মিল নেই, স-মিল নেই । নেই নেই আর নেই । কিন্তু একটু খুঁজলেই দেখা যাবে আছে । কোথায় ? যে রামকৃষ্ণ পড়েছে সে জানে । আর যে জানেনা সে রামকৃষ্ণ না পড়া মানুষ । সে শোনেই নি ‘ওরে শুধু পদে পদে বিপদই দেখলি, আর পা-য় পা-য় উপায় দেখলি না’ !

মোদ্দা এই হলো কথা । কিন্তু শুনতে এত ভালো লাগে মনে ধরে কেন ? না পাশাপাশি ওদের ভারি মিল ভারি বন্ধুত্ব । পা আর পদ একই কি না ? নামে ডাকে কি আসে যায় !
— তাই বলে হরি আর হেরো এক না কি ? মিল থাকলেই হলো ?

জানতাম, আমি ঠিক জানতাম কেউ একটা গোল বাধাবেই । কিন্তু ভেবে দেখ হরিকে আমরা তো হারিয়েই বসে আছি । ধরবার চেষ্টা করো নি বলেই না ফাঁকা ফাঁকা, নেই নেই অনুভূতি । এক হিসাবে কথাটা তো ঠিক । তবে এ হারানো জয়-পরাজয়ের নয় । এ হারানোর অর্থ খোয়ানো । আর হরিকে হারিয়েছি বলেই না হেরে বসে আছি । 

— বাবা, এ যে একেবারে রামভক্ত রামছাগল ! হরিভক্ত হরিরাম !
বাহ্ বেশ চমৎকার বললে তো, কি করে বললে ভাই ? এ তো আমারই মিলমিশ সখ্যতার কথা বললে । তবে বিপরীত ভঙ্গিতে বললে । একবার উল্টে নাও পাল্টে যাবে । তবে তুমি যে উল্টে আছ এটাই আগে বুঝতে হবে । না হলেই আবার নেতি নেতি, ন্যাতানো । 

— দুর মশাই সোজা-সাপ্টা বলুন তো কি বলতে চাইছেন ?
এত সোজা করে বলছি তাও বুঝতে পারছ না? আমি মিলমিশ সখ্যতার কথা বলছি । 
— কিন্তু আমরা আপনার কথা শুনব কেন ? আপনি কে ?
সে আমার নাম শুনলেই বুঝতে পারবে । 
— কি আপনার নাম ?
সে বলছি, তবে এ নাম কে রেখেছে বলতে পারব না । 
— সে আমরা বুঝব, আপনি বলুন । 
আমার ফার্স্ট নেম : রমণী, মিডল নেম : রমণ, আর লাস্ট নেম মানে টাইটেল : কর । এবার বুঝলে তো মিলমিশ কত সুখের কত মজার !

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫
---------------------------------------------------------------------------------

|| কি নিয়ে এসেছ ||


- বলো, কি নিয়ে এসেছ ?
- খালি হাতে প্রভু । 
- ভুল । 
- বলো, কি নিয়ে যাবে ?

জীবনে এত বার ফেল করেছি এতরকম কাজ করতে গিয়ে যে আর ফেল করতে ইচ্ছে করে না । সারাজীবন সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে শুনে এলুম, খালি হাতে এসেছ খালি হাতে যাবে, সঙ্গে কিচ্ছুটি না । আর যেই প্রভুর প্রশ্নের উত্তরে বললুম, সঙ্গে সঙ্গে ভুল ! এরপর আর উত্তর দিতে ইচ্ছে করে ?

- কি হলো চুপ করে রইলে যে বড় । 
- না প্রভু ...
- কি না ? বলো ...
- খালি হাতে প্রভু । 
- ফের ভুল । 
- এ্যাঁ ....

এ্যাঁ নয়, হ্যাঁ । যা শিখেছ সব ভুল । আর কি হবে, বাবাগুলোই কিছু জানে না তো ছেলেগুলো শিখবে কোত্থেকে ? খালি হাতে এসেছে ! আদিখ্যেতা ! খালি হাতে মানে ? ও তো তোমার চোখের দেখা । হাত খালি । আমি জিজ্ঞেস করলুম কি নিয়ে এসেছ ? এখন তোমার বয়স পঞ্চাশ । এতখানি জীবনে কি বলতে চাও তুমি যা যা পেয়েছ সব তোমার চেষ্টায় ? বিয়ের সময় দিদিশাশুড়ি টুপ করে গলায় একটা দু ভরির সোনার চেন দিয়ে আশীর্বাদ করল, সেটা ? শ্বশুরমশাই ওমেগা ঘড়ি । অমন পরীর মতো মেয়ের বাবা হ’লে । মেয়ের রূপটা কি তোমার তৈরি ? সকলের হয় ? যে বাড়িতে আছো তার একটা কিছু  ... ইট কাঠ থেকে শুরু করে সিন্দুকের যা কিছু ভোগ করছ বাবা সে কি তোমার নিজের রোজগারের পয়সায় ? আবার বলে কি না খালি হাতে ! শুধু বয়স হয়েছে সংখ্যায়, বুদ্ধিতে বয়স সেই ফেলটুস মেরে বসে আছে । 

- মাথায় ঢুকল কিছু ?
- আজ্ঞে ?
- বলছি বুঝতে পারলে কিছু ?
- হ্যাঁ প্রভু । 
- তাহলে এবার বলো কি নিয়ে যাবে …

মাথার মধ্যে সেই একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল …  খালি হাতে , খালি হাতে । তারপর বলি, আর একঘর লোকের সামনে আবার ফেল । এ লজ্জা কি আর থামবে না ? কি পাপ করেছিলাম কে জানে ! সব কত কম বয়সী ছেলে মেয়ের সামনে আর কত অপদস্থ হবো রে বাবা । প্রথমে তো বলেইছিলুম, খালি হাতে , তো সেটা ভুল যখন কি বলি এবার ?

ভাবো ভাবো, তোমরা সবাই ভাবো । আমি শুধু ওকে প্রশ্নটা করেছি ভেবো না, আমি জানি তোমাদের সকলের ঐ একই উত্তর । ও খামোখা লজ্জা পাচ্ছে । তোর এত লজ্জা পাবার কিছু নেই । ওরে, ওরা সবাই তোর মতো নাবালক নাবালিকা । বয়সগুলোই যা শুধু ভুঁড়ির মতো ফুলে উঠেছে । বুদ্ধিতে সবাই বেতো । নড়েও না চড়েও না । একটু নড়তে চড়তে গেলেই উঃ আঃ । আর বুদ্ধির কি বা দোষ , খেতে পায় তো শুধু খবর আর খবরের কাগজ । 
ঘরের মধ্যে একদম নিরামিষ নিস্তব্ধতা । যেন খুবই একটা বেশ মার্জিত সভ্য শ্রাদ্ধবাসর । কেউ কোনও কথা বলছে না । একেবারে ঠাণ্ডা দইয়ের মতো জমাট মেরে গেছে । একটা ঘোলমউনি দিয়ে ঘাঁটিয়ে না দিলে কিচ্ছুটি হবার নয় ।  তো ঢালো জল । তাই একটু সাহসে ভর করে বললুম, বুঝতেই তো পারছেন প্রভু যা বলব তা ভুল, তার চেয়ে ঢের ভালো আপনিই বলুন । আমরা শুনি ।
প্রভু একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসলেন । 
- কি চালাক দেখেছ ! একেবারে বিচ্ছু । ওর হার স্বীকার করে নিলেই কি খেলা শেষ ? খুব তো হিন্দি সিনেমা দেখিস, ভিলেনকে হারিয়ে যখন হিরো বলে - চুন চুন কে বদলা লুঙ্গা ....খুব মজা লাগে । হেব্বি দিয়েছে ! এবার ? কেমন লাগছে ?
যেমনই লাগুক, এরকম রসিক গুরুদেব পেলে আমি রোজ দুবার কেন দু'শো বার হারতে প্রস্তুত । কি সুন্দর বলে বলো ? কোথায় দিব্যজ্ঞান আর কোথায় হিন্দি সিনেমা ! সব একদম ককটেল মকটেল করে ছেড়ে দিলে গো । আমার টেল-এ একটু টান পড়ল বটে, তা পড়ুক । কিছু একটা ভালো জানা তো হলো । 

শোনো তবে বলি । খালি পায়ে খালি হাতে কেউ যায় না । কেউ যাবেও না । ঐ যে আসার সময় খালি হাতে এলে কিন্তু সোনার হারটা পেলে । ঠিক তেমনই ঐ খালি পায়ে যাবে কিন্তু জেনে রাখো তোমার জন্য উল্টোডাঙার বস্তিও রেডি আবার আমেরিকার উঁচু নব্বই তলার ফ্ল্যাটও রেডি । এছাড়াও মাঝেমধ্যে ছোটো বড় মাঝারি … হাতে অনেককিছু আছে । সবই সাজানো । কিন্তু কোথায় যাবে কে ঠিক করবে ? না তুমি । এ কি প্রচণ্ড স্বাধীনতা একবার ভাবো । যদি বুঝতে পারো তো সেইমতো চলো । আর একেই বলে, বোঝো মন যে জান সন্ধান । সন্ধান করো, সন্ধান । কোথায় যেতে চাও তুমি । ঠিকানা ঠিকই দেখতে পাবে ।

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫
--------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Subir Kumar Das in WaaS / September 2015

Sep 26, 2015

নন্দর কথা

|| নন্দর কথা ||


হঠাৎ কেন জানিনা আজ নন্দর কথা মনে পড়ছে । নন্দ ইংরেজি বলতে চাইতো, ভালোবাসতো - সেটা দোষের কিছু  তো নয়, আজকাল তো তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্ব বুক ফুলিয়ে এমন ইংরেজি বলে থাকেন লজ্জায় মুখ লুকোনোর জায়গা থাকে না। নন্দর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না, তবু আমরা হাসতাম কারণ তখন মাঠে-ময়দানে এমন হাস্য রসাত্মক ইংরেজি যখন তখন শুনতে হতো না । 

যাই হোক, নন্দর সম্পর্কে নানান মজার ঘটনার কথা শুনতাম, সবটা যে বিশ্বাস করতাম এমনটা নয় । বিশ্বাস করতে হল খেলতে গিয়ে । সেটা ৭০ দশকের গোড়া । সিঁথির দিকে ক্রিকেট ম্যাচ খেলা, তখনো ওদিকের ভেতর দিকে তেমন জনবসতি গড়ে ওঠেনি, সেখানেই এক বিরাট খেলার মাঠ । প্রথমে ব্যাট করেছে স্থানীয় দল, রান তেমন করে নি, দুর্ভাগ্যক্রমে আমি ভালো বল করে পাঁচটা উইকেট পেয়েছি । লাঞ্চের ব্যবস্থা তারাই করেছে, আমরা গেস্ট বলে কথা ! খাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি, হঠাৎ একটি ছেলের উদয় । এসেই বলল, “বেল্টটা কোথায় রে ?” বুঝলাম ভালো বল করার ফল এবার পেতে হবে । আমার মুখের অবস্থা অনুধাবন করে যে আমাদের খেলাতে নিয়ে গিয়েছিল সে সজোরে হেসে উঠে বলল,”ভয় পেয়ে গেলি নাকি ? আরে ওই তো আমাদের দি গ্রেট নন্দ । এই নন্দ এদিকে আয়, কি চাইছিস ?” নন্দ উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরে খেলা শুরু করতে হবে তো, বেল্টটা কোথায় গেল খুঁজে পাচ্ছি না ।” এবার বুঝলাম বেল্ট নয়, ও উইকেটের বেল খুঁজছে । খেলা শেষ হতে আমাদের এসে জড়িয়ে ধরল নন্দ আমরা জিতেছি বলে, বড় রাস্তার চায়ের দোকানে জোর করে আমাদের চা-বিস্কুট খাওয়াল । আমাদের সেই বন্ধুটি নন্দকে বলল, “এরা তো তোকে মিথ্যে বলবে না, ওদের জিগ্যেস কর সত্যি কি না ?” নন্দ আবার উত্তেজিত, “দাদা, সত্যি করে বলুন তো, সাহেবদের ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ইংরেজি বলতে পারে ? সত্যি করে বলবেন, ঐটুকু বাচ্চারা কখনো ইংরেজি বলতে পারে ? আমি জানি না বলে ওরা আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করে ।” উত্তর না দিয়ে সেদিন একটু হেসে পাশ কাটিয়েছিলাম, নন্দর সরল বিশ্বাসে সেদিন আঘাত করতে চাইনি । 

এবার বলি নন্দর ইংরেজির নমুনার কথা । বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় তখন । সন্ধ্যে হলেই সব অন্ধকার, রাস্তার বাতিতে ঠুলি লাগানো, বাড়ির সব দরজা-জানালা বন্ধ । নন্দ সিভিল ডিফেন্সের সক্রিয় কর্মী, উত্তরের আশায় জোর টর্চের আলো ফেলেছে, কিন্তু উল্টো দিক থেকে কেউ আলো জ্বালিয়ে প্রত্যুত্তর দেয়নি । নন্দ যথারীতি উত্তেজিত হয়ে পরের দিন অফিসে রিপোর্ট করে বলল, “সিঙ্গেল দিচ্ছি, সিঙ্গেল দিচ্ছি, বাট নো রিপোস, হাউ স্ট্রেন্থ !” আসলে নন্দর বক্তব্য ছিল “সিগন্যাল দিচ্ছি, সিগন্যাল দিচ্ছি বাট নো রেসপন্স, হাউ স্ট্রেঞ্জ !” 

এই হল নন্দ । পাড়ার খুব পুরনো প্রতিবেশী চলে যাচ্ছেন, ভদ্রলোকের লোকবল কম তাই পাড়ার ছেলেদের সাহায্য চেয়েছেন । নন্দ আর সকলের সংগে খুব খাটা খাটুনি করে ভদ্রলোকের মালপত্র লরিতে তুলে দিল। ভদ্রলোক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “তোমরা আমার যা উপকার করলে আমি জীবনে ভুলবো না ।” নন্দ তার থেকেও বিনীত হয়ে আগ বাড়িয়ে বলে উঠলো, “কই আর তেমন কোএডুকেশন করতে পারলাম ?” ভদ্রলোকের চক্ষু চড়কগাছ, বলে কি ! আসলে নন্দ কোঅপারেশন বলতে চেয়েছিল । 

নন্দ এখন কোথায় আছে, কেমন আছে জানি না । ভুল ইংরেজি শুনলেই আমার কেন জানিনা নন্দর মুখটা ভেসে ওঠে । নন্দ কি ইংরেজি বলা শিখতে পেরেছিল শেষ পর্যন্ত ?

------------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Siddhartha Chakraborty in WaaS / 26 September 2015

বঙ্গ-দর্শন

|| বঙ্গ-দর্শন ||


ট্রামের লাইন জলে বোজা          
ঘোড়ার আবার লেজটা সোজা |
গড়ের মাঠে লাঠি হাতে
অনেক লোকের মেলা,
ছোট্ট সাদা বল মেরে
গর্ত গর্ত খেলা |
নিজাম বাড়ির এদিক ওদিক
বিরিয়ানির ঘি,
ইফতারটা আসবে কবে
ভাবছে সিদ্দিকী |
দাস সাহেবের বন্ধ টিনে
হচ্ছে পাচার মিষ্টি,
টিকিট কেটে উঠছে কিনা
কালো কোটের দৃষ্টি |
পৈতে ধোয়া গঙ্গাজলে
বাসী মালা ভেসে চলে,
শিশিভরে বাড়ি চলে
পুন্যি-স্নানের দল,
একটুখানি ছিটিয়ে দিলেই
হাতে-নাতে ফল |
বাসের ভিতর অনেক লোকে
মেয়েলি সিটে দাঁড়িয়ে থাকে
কন্ডাক্টর আর্জি করেন
টিকিটটা হাত বাড়ান
যাত্রীরা সব মর্জি ধরেন
বাসটা আগে চালান |
বড় দোকান, ছোট শিশি
ডয়েশ ডাক্তার, বয়েস বেশি
রুগীর মুখে দু’চার ফোঁটা
যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা |
নতুন দ্বীপের মায়ারা সব
রঙিন শাড়ি লেপ্টে পরেন 
খড়ের গাদায় লুকিয়ে হরি
বাঁশির সুরে সিটি মারেন |
মামী বলে ছাড় পাবে না 
পুকুরঘাটে আর যাবে না 
কলসি হবে কানা কানা
তাই বলে কি প্রেম দেব না ?
দুপুরবেলা বিবাদী বাগে
দোসার আদর তুঙ্গে থাকে
বিকেল হলেই মাটির ভাঁড়ে
কিম্বা ছোট কেটলি করে
ধুম্রপানের আসর জমায়
হাওয়াই চটির দল
বাড়ি ফেরার আগেই কাল
স্ট্রাইক কিনা বল !
কুমারটুলির খড়ের মাটি
ঢাকিপাড়ায় পড়ল চাঁটি
রাস্তাজুড়ে বাঁশের বাড়ি
চলবে না আর কোনও গাড়ি
মোড়ে মোড়ে রোলের কদর
এন্টাসিডের বাড়ছে আদর
চারটি দিনের বাপের বাড়ি
পয়সা খতম, শুকনো হাঁড়ি |
পাড়ার মোড়ে বিকেলবেলা
তেঁতুলগোলা জলের খেলা,
চটকে আলু, মাখবে জোরে
ভাজা মশলা, লঙ্কা ভরে
Zম্বিরা সব দাঁড়িয়ে থাকে
বাড়িয়ে তাদের হাত
শালপাতাদের মৃতদেহে
ট্র্যাফিক কুপোকাত
অমাবস্যায় মাইক বাজায়
সাজিয়ে নিয়ে বোতল,
বলতে গেলেই মারবে গালি
কেউবা হবে কোতল |
খাঁড়ার ভয়ে, গাঁজার দমে
শুয়ে থাকেন ভোলা
পেটের উপর শ্যামলা মেয়ে
জামা কাপড় খোলা |
রেলের তারে শকুন মরে
লাইন ধরে মানুষ চরে,
শকুন ব্যাটা অলুক্ষুনে
সময় পেল না,
বাড়ি ফেরার সময়ে আর হাঁটতে পারি না |
হাওড়া ব্রিজের মাথার ওপর
একটা পাগল উঠলো দেখে
উর্দিপরা পেটমোটারা
হঠাত কেমন গেল খেপে |
কালো যন্ত্রে টক্কাটরে
লালবাড়িরা জীপে চড়ে
খবরবাবু তড়িত বেগে
Chaliye ashen jan,
চালিয়ে আসেন যান,
কেবা আগে ভাঙ্গবে খবর
জিতবে উসেইন রান |
রাইটার্সের বন্ধ ঘরে
লেফ্ট রাইট খেলা,
পাঁচটা বছর কে লুটবে
সকাল সন্ধ্যা বেলা |
অনেক কিছু লিখেই চলি
পাতার পর পাতা, 
এসব কিছু দেখতে হলে
শহর কলকাতা ||

----------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Udayan Dasgupta / 26 September 2015

Sep 25, 2015

নারায়ণ নিদ্রা গেছেন

|| নারায়ণ নিদ্রা গেছেন ||


সকাল বেলা সিধু বাবু ঠাকুর ঘরে এসে,
ভাবতে ছিলেন, কি হবে আজ বিজু বাবুর কেসে ।
বিজু বাবুর জমিটা, সিধুর জমির পাশে,
বন্ধু ছিলেন, শত্রু হলেন গত কয়েক মাসে ।
কয়েক কাঠার ঝগড়া নিয়ে, মামলা আদালতে,
জমির দামের বেশী গেছে, উকিল বাবুর পেটে ।
সিধু বাবু খালি পেটে, ঠাকুর ঘরে এসে,
'হে নারায়ণ, জিতিয়ে দাও, আজকের এই কেসে ।
বিজু বাবু ও কম যান না, তিনি ও ঠাকুর ঘরে,
তিনি ও ডাকেন, 'নারায়ণ, সিধুকে দাও মেরে ।'

নারায়ণ শুনতে পেলেন বৈকুন্ঠে শুয়ে,
দুই জনের আর্জি শুনে, শুলেন বাঁ-কাত হয়ে ।

অফিসে তে ইঁদুর-দৌড়, সবাই চাইছে প্রমোশন,
পদ তো খালি একখানি, যাবে তো এক জন ।
লেঙ্গি মারা চলছে ভীষন, কি হবে সেই নিয়ে,
ফুল-মিষ্টি-প্রণামি ঘুঁষ, মন্দিরেতে গিয়ে ।

নারদ মুনি, করলেন রিপোর্ট নারায়ণ কে গিয়ে,
পাশ ফিরে শোন নারায়ণ, চাদর মুড়ি দিয়ে ।

অতুল, রাতুল দুই জনেতেই এক ই ক্লাসে পড়ে,
প্রথম স্থানটি বাঁধা থাকে কোনো একজন করে । 
মাধ্যমিকে দু জনেতেই ভগবান কে ডাকে,
ফল বেরুলে, যেন আমিই থাকি অন্যজনের আগে ।

ভগবান তো জেগেই ছিলেন, শুনতে সবই পান,
আগ মার্কা সর্ষের তেলে, নাকে দিলেন টান ।
ভাবতে বসেন গভীর ভাবে, কি ভাবে এ হয়,
সব্বাই কে জিতিয়ে দেওয়া তাঁর কর্ম নয় ।

বিপদ বুঝে যোগ-নিদ্রায় ঠাকুর নারায়ণ,
কেউ জানি না, এই নিদ্রা তার চলবে কতক্ষণ ।।

(প্রয়াত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় 'বনফুল' এর একটি ছোট গল্প অবলম্বনে আমার এই কবিতা লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস)

--------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Kalyan Kumar Basu in WaaS / 25 September 2015

বাঙালীর দ্বিতীয় আবিষ্কার

।। বাঙালীর দ্বিতীয় আবিষ্কার ।।


অনেকদিন আগেকার কথা । বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশ শাসনের সূর্য মধ্যগগণে বিরাজমান ।

দীর্ঘদিন কোলকাতা ভারতবর্ষের রাজধানী থাকার সুবাদে চাকুরী উপলক্ষে বাঙ্গালী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে । এই ভাবে 'কড়ি' বাবুরা আসামের বিভিন্ন প্রান্তে বসতি স্থাপন করে নিজের নামের সাথে সঙ্গতি রেখে গ্রাম / শহর স্থাপন করে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেন ।

সেই সময় একবার আসামের তিনসুকিয়ার তিনকড়ি তাঁতি এবং পাঁচগাঁও (পাঁচগ্রাম) এর পাঁচকড়ি পাঁজা তাদের বিশেষ বন্ধু ছয়গাঁও এর ছগনলাল ছাবাড়িয়ার বাড়ীতে আমন্ত্রিত হয়ে বেড়াতে যান । সেখানে ওনারা ক্রমে সাতগাঁও এর সাতকড়ি সাহা, আঠগাঁও এর আটকড়ি আঢ্য এবং নওগাঁও এর নয়কড়ি নাহার সাথে পরিচিত হন এবং সকলে মিলে যৌথ উদ্যোগে দশ দিন ব্যাপী কঠোর গবেষণার পর একাদশ দিনে এক চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কারে সফলতা অর্জন করেন । দ্বাদশ দিনে তৎকালীন চীফ কমিশনার তার উচ্চ প্রশংসা করেন, এবং বাংলার গভর্নরের সঙ্গে তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন । ত্রয়োদশ দিনে সর্বসাধারণের উপকারের জন্য নিম্নলিখিত আকারে সেই আবিষ্কার সামাজিক মাধ্যমসমূহে প্রকাশ করা হয় :-

To walk in the morning is good for health.
প্রাতঃ ভ্রমণ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ।
सुबह टहलना सेहत के लिये अच्छा है ।

পরবর্তীকালে, গভর্নর সাহেব কোলকাতার তৎকালীন বঙ্গীয় সুধী সমাজের তিন বিখ্যাত ব্যক্তি, যথাক্রমে খড়গপুরের খগেনচন্দ্র খাসনবীশ, মোমিনপুরের মোহন চন্দ্র মহলানবিশ এবং পাতিপুকুরের পতিতপাবন পত্রনবিস, এর সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন । ওনারা এর ওপর আরও সুদীর্ঘ গবেষণা করে কিছু সংশোধনী আনয়ন করেন, যেমন :-

To walk in the morning is good for all, but pole vault and gymnastics are not suitable for senior citizens.
প্রাতঃ ভ্রমণ সকলের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী । কিন্তু বংশদণ্ড-দ্বারা উল্লম্ফন এবং উচ্চ মার্গের শারীরিক কসরঽ প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিপজ্জনক ।
सुबह टहलना सभी के लिये अच्छा है, लेकिन पोल भल्ट और जिमन्यास्टिक्स बरिष्ठ नागरिककों लिये खतरनाक साबित हो सकता है ।

পরে এই সংশোধিত আবিষ্কার American Health Association এর অনুমোদন লাভ করে, এবং সারা বিশ্বে তার দ্রুত প্রসার ঘটে । আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, চার্চিল, রুজভেল্ট, হিটলার, মুসোলিনি, মহারাণী ভিক্টোরিয়া, জাপানের রাজা মিকাডো – এঁরা প্রত্যেকেই এই আবিষ্কারের দ্বারা প্রভূত উপকৃত হন বলে জানা যায় । তবে তাঁরা উল্লম্ফন ইত্যাদি কসরঽ করতেন কিনা সে বিষয়ে বিশদ জানা যায়নি । তাঁরা এবং অন্যান্য দেশের প্রধানগণ তাদের জনসাধারণের প্রাতঃভ্রমণের সুবিধার্থে বিভিন্ন শহরে অসংখ্য পার্ক নির্মাণ করে দেন । ভারতবর্ষেও গান্ধীজী, নেহেরু, সুভাষ বোস, রাজেন্দ্র প্রসাদ, তিলক প্রভৃতি বরেণ্য নেতারা নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ করতেন । রিচার্ড এটেনবরো সাহেবের ‘গান্ধী"’ ছবি থেকে অনুমান করা যায় যে, গান্ধীজী খুব দ্রুত বেগে পাদচারণা করতে সক্ষম ছিলেন ।

অধুনা কোলকাতা এবং ভারতবর্ষের অন্যান্য শহর গুলিতে প্রাতঃভ্রমণ খুবই জনপ্রিয় । আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই এর উপকারিতা সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল এবং বিভিন্ন পার্কে তাদের দ্রুত বেগে পদচারণ করতে দেখা যায় ।

আমাদের WaaS Group এর সর্বশ্রী অলোক কুমার চ্যাটার্জি, শিশিরকান্ত মিশ্র, সুদীপ রায় এবং অরবিন্দ ঘোষ মহাশয়ের Group page এ পাঠানো ছবিগুলি দেখে প্রতীয়মান হয় যে ওনারা এর উপকারিতা সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত এবং নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ করে থাকেন । তবে এর মধ্যে কেউ কেউ আবার পদচারণ শেষে গৃহিণীর কঠোর নিষেধ সত্যেও ফুটপাতে অবস্থিত দোকানে গিয়ে গরম সিঙ্গাড়া-জিলাপি ইত্যাদি ভক্ষণ করে থাকেন, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে অণুকুল নয় ।

এই আবিষ্কারের অবশ্যই একটি নেতিবাচক দিকও আছে । শোনা যায়, এরপর লম্ফ এবং শারীরিক কসরত ক্রীড়ার জনপ্রিয়তা বাঙ্গালীর মধ্যে ভীষণ ভাবে কমে যায় । যদিও অধুনা ত্রিপুরা রাজ্যে গুটিকয়েক যুবা শারীরিক কসরতে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, কিন্তু লম্ফ ক্রীড়ায় আজ অবধি কোন বঙ্গ-সন্তান জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে কোনরূপ দক্ষতা দেখাতে পারে নি । বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য বলেন, বৃহত্তর মানবজাতির স্বার্থের তুলনায় এই ক্ষুদ্র আত্মত্যাগ কিছুই নয় ।

বাঙ্গালীর প্রথম স্বীকৃত আবিষ্কার হচ্ছে জুতা । রবীন্দ্রনাথের "জুতা আবিষ্কার" কবিতায় সেই চমকপ্রদ ঐতিহাসিক কাহিনীর বিস্তৃত বর্ণনা আছে ।

ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে হবুচন্দ্র রাজা এবং গবুচন্দ্র মন্ত্রীর জুতা আবিষ্কারের পরে সুদীর্ঘ কালের খরা কাটিয়ে বিংশ শতাব্দীতে বাঙ্গালী আবার নতুন এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে ।

তাই দেখে কান্ত কবি গেয়ে গেছেন,"বল বল বল সবে,শত বীণা বেণু রবে, বাঙ্গালী আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে"


-------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Shyamal Kumar Das in WaaS / 25 September 2015

দেড় টাকার অনেক দাম

।। দেড় টাকার অনেক দাম ।।


ছিমছাম দোতলা বাড়ির নীচতলায় ভাড়াটে । উপর তলায় অকৃতদার মেজদা আর সবার ছোট ভাই তার বৌ আর মেয়ে নিয়ে থাকে ।

মেজদা আসে পাশের সব সান্ধ্য বাজার ঘুরে যথাসম্ভব সস্তায় তিনটে কৈ মাছ কিনে এনে মাটির কলসিতে জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখলেন । রাত্রে টয়লেটে যেতে গিয়ে ছোট ভাইয়ের বৌয়ের পায়ে কাঁটা ফুটল । উঃ করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো – মেজদার ঘুম ভাঙলে মুশকিল হবে, একেকটা ঘুমের ওষুধের দাম ৩৫ পয়সা ।

সাবধানে বাতি জ্বেলে দেখল একটা কৈ কলসিতে, একটা মাটিতে পড়ে সাতার কাটছে । এই ব্যাটাই পায়ে কাঁটা ফুটিয়েছিল । ‘মেরেই ফেলবো’ বলে পা তুলেছিল, কি মেজদার কথা মনে পড়ে যাওয়াতে নিজেকে সামলে নিলো – একটা কৈ মাছ মানে দেড় টাকা, মেজদা জানলে সর্বনাশ । কোনও মতে মাছটা তুলে নিয়ে কলসিতে ঢুকিয়ে রাখল । কিন্তু তিন নম্বরটা গেলো কোথায় ? টের পেলো প্যানে বসে – শব্দে না গন্ধে কে জানে, তিন নম্বরটা হেভি খলবল করতে শুরু করল ।

কী আর করা যায় ? বৌ কলসির কৈ দুটোকেই ভালো করে চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লো ।

সকাল বেলায় উঠে দেখে মেজদা মাছ কাটছে – কৈ মাছ – তিনটেই ।।


------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by Arabinda Ghosh in WaaS / 25 September 2015

Sep 24, 2015

এখন সম্বল

|| এখন সম্বল ||


অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত আমি ।
যে ছায়াপথে হেঁটেছি এতো দিন
সে তো কোলে দেয় নাই স্থান
পথ হারা, বাস্তুহারা, ঘুরি দ্বারে দ্বারে
দিন মোর কেটে যায় উচ্ছিষ্ট আহারে ।

জীবনের বহুদিন কেটে গেছে নক্ষত্রের ভিড়ে
অর্থ, মান, যশ আজ কিছু নাই
পিছে পড়ে আছে মোর যা ছিল বৈভব
মলিন বসনে ঢাকি শীর্ণ দেহ মোর
একা ঘুরি পথে পথে ঠিকানা হারায়ে ।
আপন যারা ছিল সব গেছে দৃঢ়ে
বিষণ্ণ বেলায় ফিরি দুয়ারে দুয়ারে ।

সন্ধ্যাদীপ নিভে গেছে, চারিদিকে ঘোর অন্ধকার
জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেব সাধ্য নাই তার
কি দিয়েছে নিজ ঘর, আত্ম পরিজন ? 
একজন ঘরে ছিল সেও গেছে দূরে
এখন সম্বল শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস
ক’টা দিন পরেই হয়ে যাব বেওয়ারিশ লাশ ।।

------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Subhas Choudhury in WaaS / 24 September 2015

Sep 23, 2015

আদর্শ ইনসাফ

।। আদর্শ ইনসাফ ।।


মাঠঘাট জল নদীর বালি ইজ্জত সম্মান,
বাইজির নাচ, ঘরের বধূ, ভোরের পোলাপান, 
সব কিছুকেই বেবাক বেচুন মূল্য সঠিক জেনে
বিকিকিনির হাটবাজারে বিবেককে না টেনে ।

রিজবানুরে বিক্রি করে শক্ত ভোটের মাটি,
কামদুনিকে সস্তাদরে কিনেছে এক পার্টি ।
দমদমেতে রেলের লাইন রক্তবানে ভাসা,
সেই টোডিরাই শুদ্ধ এখন গঙ্গাজলে খাসা !

অন্তর্বাস-বাণিয়াদের কিস্যা, হিস্যা বাত
কে বোলাল কার শরীরে অশ্লীলতার হাত !
ইনসাফ দাও, বিশ্বাস দাও, ইমান বেচে দাও
গোটা দেশই পুণ্যভূমি—বিপন্নতা ? ফাও,
আপাতসুখ চাও? গদিটি বাঁচাও !!!

-----------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Subho Joardar in WaaS / 23 September 2015

Sep 22, 2015

কী বার

|| কী বার ||


ঘুরতে গেছি জাঞ্জিবার
বোতল হাতে দেখি সবার ।
দারুণ ইচ্ছে হোল খাবার,
কিন্তু যে হায় পাইনা বার ।


দিনটা ছিল রবিবার।
তবে কি আজ শুকনোবার ?
বাকি ছিল চমকাবার
যখন দেখি হচ্ছে বার 


পয়সা দিলেই বারংবার
মেশিন থেকে - কী আবার ?


মদের বোতল !


-------------------------------------------------------------------
Contributed by: Arabinda Ghosh / 22 September 2015

আমার মনে অনেক দুঃখ

।। আমার মনে অনেক দুঃখ ।।


যখন প্রথম WaaS গ্রুপে জয়েন করি, সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর পোষ্ট দেখে মনটা ভরে যায় । অলোক চ্যাটার্জি, সুদীপ রায়, কমল কুমার দত্ত, অরবিন্দ ঘোষ মহাশয়দের পাঠানো ছবিগুলি দেখে ভাবতাম, ইস! আমি যদি ওনাদের মতন ছবি তুলতে পারতাম !
সেই প্রথম আমার মনে দুঃখের উদয় হয় ।

রবীন ব্যানার্জি, সোমনাথ বাবু, সুদীপ রায়, মিল্টন পাল মহাশয়দের লেখা অসাধারণ কবিতাগুলি পড়ে ভাবি আমি কেন ওঁদের মতন লিখতে পারি না ।
এই ভেবে আবার মনে দুঃখ হয় ।

শিবাজী গাঙ্গুলি এবং কমল দত্ত মহাশয়দের পুরনো দিনের কোলকাতা ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিরল ছবিগুলি দেখি আর ভাবি আমি কেন এরকম ছবি কোথাও খুঁজে পাইনা । সুদীপ রায় মহাশয়ের World's Acclaimed Photography ও দুর্ধর্ষ Sketch গুলি অবাক বিস্ময়ে দেখি, আর ভাবি আমি তো এঁদের কাছাকাছি কোন দিনই পৌঁছুতে পারব না ।
তাই আমার মনে অনেক দুঃখ ।

আর ফিলিপ্স বিশ্বাস মহাশয় তো জ্ঞানের ভাণ্ডার । রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, পুরাণের কাহিনী তথা দোলা বৌদি এবং ডাক্তার বাবুর রসপূর্ণ লেখাগুলি পড়ি, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি আমি কেন ওনাদের মতন লিখতে পারি না ।

আর কমল বাবু তো WaaS-এর Encyclopedia ! সব মেম্বারদের জন্মদিন ওনার জানা । সুদীপ রায় মহাশয়ও কিছু কম যান না । সারা বিশ্বের সব বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্মদিন ওনার জানা । দেখি আর ভাবি আমি কেন ওরকম তথ্য যোগাড় করতে পারিনা!অরবিন্দ ঘোষ মহাশয়ের সুস্বাদু রেসিপি গুলি দেখি আর মনে মনে ভাবি আমি কেন এ রকম পারি না ।

মিল্টন পাল ও প্রবীর আচার্য মহাশয়দের ইঙ্গ-বঙ্গ সরল অভিধানে মাঝে মাঝে নাক গলাবার দুঃসাহস করে, পরে হাল ছেড়ে দিয়েছি । বুঝে গেছি অত হাই লেভেলের ব্যাপার আমার দ্বারা হবেনা । আর শোভন রায় মহাশয় তো Jokes & Humour- এর রাজার রাজা রাজাধিরাজ! দেবকিশোর বাবু, প্রদীপ চ্যাটার্জি, গৌতম সেন, অরবিন্দ ঘোষ, সৌমেন বাবুরাও হাস্যরসে কোন অংশে কম যান না । আমি তো এরকম কিছু পারি না ।
তাই আমার মনে অনেক দুঃখ ।

আর ফডনভিস সাহেবের দেশের উদয়ন দাসগুপ্ত মহাশয় তো কমেন্ট-সম্রাট । যদিও সেগুলি ভীষণ হাই লেভেলের । উমেশ দুবে, শিশিরদা আর বিনায়ক বাবু, জ্যোতির্ময় দাস সাহেব –ওনারা তথ্যসমৃদ্ধ যুক্তিপূর্ণ কমেন্টসমূহ অতি সুন্দর ভাবে পেশ করেন । ওগুলো পড়ি আর ভাবি আমি তো এত সুন্দর ভাবে লিখতে পারব না ।
তাই আমার মনে অনেক দুঃখ ।

একদিন কবিতা লেখার চেষ্টা করে খুব ভোরে উঠে জানালার ধারে কাগজ-কলম নিয়ে বসি । দেখি সামনের ফুলগাছ গুলোতে হেমন্তের শিশিরের ছোঁয়া লেগেছে । মুড এসে গেল – লিখে ফেললাম,

"পাতায় পাতায় পড়ে শীতের শিশির"

প্রথম লাইনটা লিখে মনটা খুশীতে ভরে গেল । কিন্তু, এরপর অনেক চেষ্টা করেও কিছুই মনে আসল না । এমন সময় দেখি, পাড়ার বিনুর পিসি ফুল তুলতে বেরিয়েছেন । ব্যস, ওমনি লিখে ফেলি:

"তাতে কিবা আসে যায় বিনুর পিসির"

গিন্নিকে দেখাতে উনি তো পড়ে রেগে কাঁই । এরপর আর কোনদিন দুঃসাহস করিনি ।
তাই আমার মনে অনেক দুঃখ ।

কিন্তু এতসব দুঃখ ছাপিয়ে মনটা প্রসন্নতায় ভরে উঠে যখন ভাবি এই গ্রুপে আসার পরই তো কত জ্ঞানী-গুণী লোকের সান্নিধ্যে এসেছি । জানতে ও শিখতে পেরেছি অনেক নতুন জিনিস ও তথ্য যা এই বার্ধক্যয়ের পথে চলার পাথেয় । এ যেন চাঁদের হাট ! Constellation of Stars! কাকে ছেড়ে কার কথা বলব !

গতবারের মত এবারও পুজোয় গ্রুপের ম্যাগাজিন "সন্ধ্যারাগ" মহালয়ার আগে প্রকাশিত হচ্ছে । আপনাদের সবাকার লেখনীর অমৃত সুধারস থেকে নিঃসৃত সেইসব গল্প, কবিতা, ছবি, তুলিকলা, কৌতুকে ভরা সেই পত্রিকার আশায় অধীর আগ্রহে দিন গুনছি ।

এই ভেবে আমার মন এখন পুলকে ভরপুর । এখন আর আমার মনে কোন দুঃখ নেই ।


-----------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Shyamal Kumar Das in WaaS / 22 September 2015

ঘ্রাণেন

|| ঘ্রাণেন ||


শিব্রাম গেছিলেন চাইনিজ হোটেলে,
চীনা খাওয়া কভু তার জোটে নি তো কপালে ।

মেনু কার্ড দেখে তিনি জল খান এক গ্লাস,
কি সব যে লেখা আছে এটা সেটা ছাইপাঁশ ।

চোখ ওঠে কপালে, ডান দিকে দেখে দাম,
শিরদাঁড়া কেঁপে গিয়ে, কপালেতে জমে ঘাম ।

অর্ডার নেবে বলে, কাছে এলো ওয়েটার,
কম দামে, এনে দিল মিনারেল ওয়াটার ।

পেটে ছুঁচো মারে ডন, পকেটে পয়সা নাই,
শিব্রাম ভাবে বসে, কি করে খাবার পাই ।

চারিদিকে খায় সব উপাদেয় খাদ্য,
চাইনিজ খাবারের কি দারুণ গন্ধ ।

জল খেয়ে ভাবে বসে, খাওয়া যায় কেমনে,
তখনি এলো তার সেই শ্লোক স্মরণে ।

"ঘ্রাণেন অর্ধ-ভোজন" বলেছিল পণ্ডিত,
বার বার ঘ্রাণ নিলে, পেট ভরা নিশ্চিত ।

এই ভেবে বসলেন, কিচেনের পাশেতে,
গন্ধেই ভরাবো পেট, এই বড় আশা তে ।

বড় বড় শ্বাস নিয়ে, নাক ভরে গন্ধ,
দেখে তাই, ম্যানেজারের লাগে বড় সন্দ ।

ডেকে বলে, "ওই খানে করছ কি বাঙ্গালি,
গন্ধ টা চুরি করে পেট কেন ভরালি?

গন্ধটা আমি আজ দেব না কো ফোকটে",
শিব্রাম দেখালেন, দু’টি টাকা পকেটে ।

টাকা দু’টি হাতে নিয়ে ঠনঠন বাজালেন,
'দামটা শোধ হোল', এই বলে হাঁটলেন ।

ম্যানেজার রেগে বলে, "মস্করা-ঠাট্টা,
ধরে আন ব্যাটাকে মারি তিন গাঁট্টা ।"

শিব্রাম বললেন, 'খেয়েছি তো গন্ধ,
দাম তার দিয়েছি, টাকাটার শব্দ ।

যেমন খেয়েছি আমি, দাম তার তেমনি,
চীনে বাবু, তুমি আজও বাঙ্গালিকে চেন নি ।'
………………………………………
প্রয়াত শিশু-সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় শিব্রাম চক্রবর্তী র গল্প-অবলম্বনে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য - কল্যাণ কুমার বসু, ২২/৯/২০১৫

----------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Kalyan Kumar Basu in WaaS / 22 September 2015



Sep 21, 2015

পুজোর বাজার

|| পুজোর বাজার ||


‘বেশীদিন আর নেই বাকী, পুজো গেল এসে,
বাজারটা তো সুরু করো’ মেয়ে বলে হেসে ৷
‘জানি তুমি রিটায়ার্ড, নেই যে কোন কাজ
বাজার করার নাম নিলে কপালে পড়ে ভাঁজ ৷
মিছেই কেন ভাবছ, চাইব না খুব বেশী
বিলিতিতে লোভ নেই, আমি তো চাই দেশী ৷
গোটা দুই জামদানী, গোটা তিন সালোয়ার
এর সাথে ম্যাচ করে জুয়েলারি জড়োয়ার ৷
জুতো তো দিতেই হবে, আর সাধারণ শাড়ী
এইটুকুতেই চোখ কপালে, মাথায় করছ বাড়ী ৷’
মেয়ে আমার অল্পে খুশী, চায় নি কিছু বেশী
আপনারাই করুন বিচার, আমি এইবার আসি ৷৷

---------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Kesab Sanyal in WaaS / 21 September 2015

Sep 20, 2015

সামান্য কথা

|| সামান্য কথা ||


গল্পের নানা বইতে নানা গল্পে ‘পাঁজর ভেঙ্গে দেবার’ কথাটা অনেকবার পড়েছেন শরদিন্দু বাবু ।  ভাবতেন লেখকরা আবেগপ্রবণ আর অনুভূতিশীল মানুষ ।  তাই বাড়িয়ে বাড়িয়ে অনেক কথা লেখে ।  বাস্তবটা অন্য রকমের ।  লেখকদের আর বাস্তবের ওপর দখল কতটা? ওরা তো নিজেদের লেখা নিয়েই থাকে । 

বিল্টুকে নিয়ে চলে গেল ওর বাবা মা ।  অনেকদিন ছিল ছেলেটা ।  একটা বিদেশী ওষুধের কোম্পানিতে কাজ করে সুশোভন ।  তাঁর ছেলে ।  এতদিন সমস্যা ছিল না ।  কোলকাতায় অফিস হওয়ায় এখানেই ছিল । 

ছেলের ভাল বিয়ে দিয়েছেন ।  রূপসী বৌ এসেছে ঘরে ।  আর তার বছর দুয়েকের মধ্যে বিল্টু এসেছে ।  আদর করে নাতিকে ডাকেন রাজপুত্তুর বলে ।  কথায় বলে থার্ড জেনারেশনের সঙ্গেই নাকি সব মানুষের খুব সদ্ভাব ।  তাই ছেলেমেয়েরা দূরে সরে গেলেও নাতি নাতনিরা ঠিক কাছে চলে আছে ।  মানে মনের কাছে । তার সঙ্গেই যত গল্প, যত কিছু আবদার ।  এই বয়েসে তাকে পিঠে নিয়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলেন ।  সমবয়সী বন্ধুরা দেখে বলে, তুমি কি আবার ছেলেমানুষ হয়ে গেলে নাকি?
- অনেকদিন হয়ে গেছে তো তাই ভুলে গেছি ছেলেমানুষ হলে কেমন লাগে ।  হেসে উত্তর দেন শরদিন্দু বাবু ।  

সেই বিল্টুরা আজ চলে গেছে ।  কি করবে সুশোভনের ট্রান্সফার ।  ব্যাঙ্গালোর অফিসে বদলি করে দিল ।  এটা অবশ্য হওয়ারই ছিল ।  কিন্তু নাতির স্বপ্নে বিভোর দাদু মনকে তৈরি করতে পারেন নি ।  তাই এবার যথার্থই ‘পাঁজর ভেঙ্গে যাওয়ার’ উপমাটাই ঠিক মনে হল ।  আর মনে হল গল্পের লেখকরা কোনও কল্পজগতের মানুষ নন ।  কল্পনা দিয়ে লিখলেও বাস্তবের কথাই লেখেন তাঁরা ।  

ব্যাঙ্গালোর চলে গেলেও বাবার জন্যে সব ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে সুশোভন ।  ঠিকে ঝি ছাড়াও দুবেলা রান্নার একটা লোকের বন্দোবস্ত করে দিয়ে গেছে । সব আছে ।  সুখের কোনও অভাব রাখে নি ছেলে ।  বৌমাও খুব ভাল ।  রান্নার লোককে সব বুঝিয়ে দিয়ে গেছে ।  একজন বয়স্ক ব্যক্তির রান্নায় কেমন তেল মশলা দিতে হবে ।  খুব ভাজা ভুজি হবে না ।  সব সব ।  

সুখের অভাব নেই তবু অসুখে পড়লেন শরদিন্দু বাবু ।  পাঁচ ছ মাস যেন পাঁচ ছটা যুগের মত মনে হচ্ছিল ।  মাঝে মাঝে ছেলে আর বৌমা ফোনে কথা বলে ।  কিন্তু   সে এখন পড়ছে ।  স্ট্যান্ডার্ড ওয়ান হল না ? খুব পড়ার চাপ ।  সময় কই ?
ডাঃ গোস্বামী নিয়মিত চেক আপ করে যান ।  প্রেশার বাড়ছে দেখে ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে যান ।  
- আরিব্বাস, সুগারটাও ধরিয়েছেন ? ডাঃ গোস্বামী বলছিলেন, আমার একটা গর্ব ছিল মশাই আপনাকে নিয়ে ।  এত বয়েস পর্যন্ত সুগারকে ঠেকিয়ে রাখা তো চাট্টিখানি কথা নয় ।  সেই আপনি কিনা … না এত রকম সিম্পটম তো হেলাফেলার বস্তু নয় ।  
ডাঃ গোস্বামী সাজেস্ট করলেন, বলি কি নার্সিং হোমে একবার ভর্তি হয়ে যান ।  মেডিক্লেম যখন করাই আছে ।  ছেলে তো আপনার খুব ভাল ।  সব ব্যবস্থা করেই গেছে ।  
নার্সিং হোমে ‘একবার’ বেড়ান হল বটে কিন্তু অসুখ গেল না ।  ডাঃ গোস্বামী টক খাওয়া মুখ করে প্যাডে নতুন টেস্ট লিখতে যাচ্ছেন এমন সময় ফোনটা এলো । 
- হ্যালো দাদু আমি বিল্টু বলছি ।  তোমার রাজপুত্র গো । 

ডাঃ গোস্বামীকে আর নতুন টেস্ট লিখতে হয় নি ।  কেননা ‘রাজপুত্র’ বলেছিল, আমি রোজ একবার করে ফোন করব ।  বাবা মা দুজনেই পারমিশন দিয়েছে । 

- অরুণ চট্টোপাধ্যায় / ২০/০৯/২০১৫
------------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Arun Chattopadhyay in WaaS / 20 September 2015

Sep 18, 2015

জীবন অন্য সুরে

।। জীবন অন্য সুরে ।।


মেঘ কোরো না অমন করে -
তার চেয়ে ঢালো বৃষ্টি ।
মেঘ দেখলেই মন যে কাঁপে,
বুঝি এই শুরু অনাসৃষ্টি ।
চোখে চোখ রেখে সামনে দাঁড়াও -
কোথাও তুমি দেখলে ফাঁকি ।
এখনও তো আমি ডুবতে রাজী,
পথ এখনোও অনেকই বাকি ।
বয়স শুধুই বছর হিসেব -
স্বপ্ন দেখার নেইকো শেষ ।
চাও যদি ফের হোক না শুরু,
অতীত ভুলে বদলে বেশ ।
মেঘ ছেড়ে তাই আলো আনো -
আঁধার আগল সরিয়ে চুপে ।
'আমার আমি' রাখছি বাজী,
নতুন সাজে নতুন রূপে ।।


দেবদাস মিত্র
----------------------------------------------------------------------
Contributed by: Debdas Mitra / 18 September 2015


Sep 15, 2015

ফন্দী

।। ফন্দী ।।


এবার বেজায় গরম পড়েছে দেশের সর্বত্র । টিভি খুললেই পরদায় ভেসে উঠছে খরা কবলিত এলাকাগুলির ফুটিফাটা চাষের জমি, দুপুরের শুনশান পথঘাট । গছের পাতাটিও নড়ছে না বাতাসের অভাবে । মানুষ বসে বসে ধুকছে ঘরে বাইরে সর্বত্র । দিন রাতের কোনও বালাই নেই । আমিও সারারাত ঘুমোতে পারছি না গরমে কাহিল হয়ে । মাথার ওপর ফ্যান, পাশের দিকে স্ট্যান্ড ফ্যান সাইসাই করে ঘুরছে তবুও নিস্তার পাচ্ছি না গরমের হাত থেকে । ঘামে সেদ্ধ হতে হতেই কেটে যাচ্ছে গোটা রাতটা । ভোরে বিছানা ছেড়ে নামার সময় মনে হলো যেন সেই ছেলেবেলাকার বিছানায় শুয়েছিলাম এতক্ষণ । যেন হিসি করে তোষক ভিজিয়েছি স্বপ্নে দেখা বাঘের তাড়া খেয়ে! তারপরই ভয়ে কাঁটা হয়ে গেলাম । এই বুঝি মা এসে বকুনি দিয়ে বলবেন, আজও ভয় পেয়েছিস বাঘের তাড়া খেয়ে ? আর কবে বড় হবি ?

মায়ের এই বকুনি খেয়ে খেয়ে আজ এতোটাই বড় হয়ে গেছি যে আমাদের বিশাল সংসারটাই কবে যেন ছোট হয়ে গেছে! মা হয়তো সেই অভিমানেই আমাদের ছেড়ে একদিন চলেও গেলেন অন্য লোকে ! সাথে নিয়ে গেলেন বাবাকে । সেই থেকে আমাদের সংসারটা আরও ছোট হয়ে গেল । আমি, আমার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান । এই নিয়েই এখনকার এই সংসার । 

ব্যাপারটা শুধু আমার ক্ষেত্রেই যে ঘটছে তেমনটা মোটেও নয় । বন্ধুদের সাথে দেখা হলেই সব ছেড়ে শুধুই গরমে কাহিল হয়ে পড়ার গল্প হয়ে চলেছে । আর একবার শুরু হলে থামার কোনও লক্ষণও দেখা যায় না! সকলেই বেজায় কাহিল যে হয়ে আছে । একমাত্র অফিসে গেলে খানিকটা নিস্তার পাই গরমের হাত থেকে । বাতানুকূল পরিবেশে কেতে যায় দিনের বেশ কিছুটা সময় । কিন্তু তারপর আবার যে সেই গরমের হাতেই সপে দিতে হয় নিজেকে । 

বাড়িতে ফিরে আসলেই প্রাকৃতিক গরমের সাথে যুক্ত হয় গিন্নির রোষানলের উত্তাপ । দু’টোকে একসাথে মানিয়ে চলতে চলতেই রাত কাবার হয়ে যায় । গিন্নীকে দোষ দিয়েও লাভ নেই । আমি তবুও বেশ কিছুটা সময় অফিসে থেকে নিস্তার পাই গরমের হাত থেকে । অথচ তাঁর বেলায় তো তেমনটা হবার উপায় নেই । শুধু তাই? তাঁর বেলায় গোঁদের ওপর বিষ ফোড়ার মত এসে জোটে রান্নাঘরের উনুনের তাপ, গরম ভাত-তরকারীর ভাপ । মাঝেমাঝেই ভাবি কী করে এখনো টিকে আছেন এতকিছু গরমের সাথে লড়াই করে! 

ভোরের দিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম । তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা ঘণ্টা খানেক পরই কেটে গেল কাঁচের জানালার পাশে এসে জুটে পাখিদের ক্যাঁচরম্যাচর করায় । বিছানা ছেড়ে নামতে যেতেই আজও মনে হলো, যেন সেই ছেলেবেলাকার বিছানায় শুয়েছিলাম এতক্ষণ । যেন হিসি করে তোষক ভিজিয়ে দিয়েছি স্বপ্নে দেখা বাঘের তাড়া খেয়ে! আজও আগের মতো নিজের অজান্তেই ভয়ে কাঁটা হয়ে গেলাম । এই বুঝি মা এসে বকুনি দিয়ে বলবেন, আজও ভয় পেয়েছিস বাঘের তাড়া খেয়ে ? আর কবে বড় হবি ?

ভাবনায় ছেদ পড়লো গিন্নীর বাক্যবাণে বিদ্ধ হতে, আর কতক্ষণ শুয়ে থাকবে? গরম-ঠাণ্ডা বলে তো নিস্তার পাবো না কোনও কালেই । সেই আমাকেই গুষ্টির পিণ্ডি যে রাঁধতে হবে গরমে ভাজা ভাজা হয়ে । তাড়াতাড়ি গিয়ে যাইহোক কিছু বাজার করে এনে উদ্ধার করো দিকি । 

বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হলো তাঁর বাক্যবাণের গুঁতোয় । হাতমুখ ধুয়ে এসে দেখি, তিনি চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । আমাকে দেখে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর ঠক্‌ করে নামিয়ে দিয়েই চলে গেলেন বাজারের থলে আনতে । যেন ইশারায় বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন চা-টুকু গিলে বাজারের পথ ধরো তো বাপু । 

চা খেয়ে বাজারের পথ ধরলাম সাইকেলে চেপে । উফ্‌ এই সাতসকালেই রাস্তায় যে গরম হাওয়া বইছে! বাজারে যাবার পথেই পড়ে খুব বড় একটা দীঘি, নাম তালপুকুর । পুকুরটা জলে টলটল করছে আপাদমস্তক । জলের বুক থেকে উঠে আসছে শীতল হাওয়া । সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম ঠাণ্ডা হাওয়ায় গা ভিজিয়ে নিতে । আহঃ কি আরাম । রাতটা যদি এখনেই কাটিয়ে দিতে পারতাম তাহলে তোফা ঘুম দেওয়া যেতো । 

এসব ভাবতে ভাবতে এদিক সেদিক তাকাতেই চোখে পড়লো ব্যাপারটা । পুকুরের পাড়েই বাঁধানো একটা ধাপে পাড়ার মস্তান কুকুরটা ঘুমিয়ে আছে চার পা ছড়িয়ে ! দেখেই চমকে উঠলাম, আরিব্বাস ! কুকুরটা তো খুব সুন্দর একটা জায়গা বেছে নিয়েছে রাত কাটানোর জন্যে! অথচ আমি কিনা ঘরের গুমোট গরমে পাখা চালিয়ে ইলেকট্রিকের বিল ভারী করছি ! 

জল থেকে উঠে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে আবার সাইকেলে চাপলাম । প্যাডেলে চাপ দিয়ে বাজারের পথ ধরে এগোতে এগোতেই মাথায় এলো ফন্দীটা । রাত্রে এসে কুকুরটাকে ভাগিয়ে দিয়ে জায়গাটা দখল করে নিলে কেমন হয় ? পরক্ষণেই একটা নিদারুণ ভয় এসে চেপে বসলো বুকের ভেতর । তখন আমাকে দেখে কেউ যদি চোর ছ্যাঁচোর বা তেমন কিছু ভবে বসে তখন কি করবো ?

--------------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Sudhansu Chakraborty in WaaS / 15 September 2015