|| সামান্য কথা ||
গল্পের নানা বইতে নানা গল্পে ‘পাঁজর ভেঙ্গে দেবার’ কথাটা অনেকবার পড়েছেন শরদিন্দু বাবু । ভাবতেন লেখকরা আবেগপ্রবণ আর অনুভূতিশীল মানুষ । তাই বাড়িয়ে বাড়িয়ে অনেক কথা লেখে । বাস্তবটা অন্য রকমের । লেখকদের আর বাস্তবের ওপর দখল কতটা? ওরা তো নিজেদের লেখা নিয়েই থাকে ।
বিল্টুকে নিয়ে চলে গেল ওর বাবা মা । অনেকদিন ছিল ছেলেটা । একটা বিদেশী ওষুধের কোম্পানিতে কাজ করে সুশোভন । তাঁর ছেলে । এতদিন সমস্যা ছিল না । কোলকাতায় অফিস হওয়ায় এখানেই ছিল ।
ছেলের ভাল বিয়ে দিয়েছেন । রূপসী বৌ এসেছে ঘরে । আর তার বছর দুয়েকের মধ্যে বিল্টু এসেছে । আদর করে নাতিকে ডাকেন রাজপুত্তুর বলে । কথায় বলে থার্ড জেনারেশনের সঙ্গেই নাকি সব মানুষের খুব সদ্ভাব । তাই ছেলেমেয়েরা দূরে সরে গেলেও নাতি নাতনিরা ঠিক কাছে চলে আছে । মানে মনের কাছে । তার সঙ্গেই যত গল্প, যত কিছু আবদার । এই বয়েসে তাকে পিঠে নিয়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলেন । সমবয়সী বন্ধুরা দেখে বলে, তুমি কি আবার ছেলেমানুষ হয়ে গেলে নাকি?
- অনেকদিন হয়ে গেছে তো তাই ভুলে গেছি ছেলেমানুষ হলে কেমন লাগে । হেসে উত্তর দেন শরদিন্দু বাবু ।
সেই বিল্টুরা আজ চলে গেছে । কি করবে সুশোভনের ট্রান্সফার । ব্যাঙ্গালোর অফিসে বদলি করে দিল । এটা অবশ্য হওয়ারই ছিল । কিন্তু নাতির স্বপ্নে বিভোর দাদু মনকে তৈরি করতে পারেন নি । তাই এবার যথার্থই ‘পাঁজর ভেঙ্গে যাওয়ার’ উপমাটাই ঠিক মনে হল । আর মনে হল গল্পের লেখকরা কোনও কল্পজগতের মানুষ নন । কল্পনা দিয়ে লিখলেও বাস্তবের কথাই লেখেন তাঁরা ।
ব্যাঙ্গালোর চলে গেলেও বাবার জন্যে সব ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে সুশোভন । ঠিকে ঝি ছাড়াও দুবেলা রান্নার একটা লোকের বন্দোবস্ত করে দিয়ে গেছে । সব আছে । সুখের কোনও অভাব রাখে নি ছেলে । বৌমাও খুব ভাল । রান্নার লোককে সব বুঝিয়ে দিয়ে গেছে । একজন বয়স্ক ব্যক্তির রান্নায় কেমন তেল মশলা দিতে হবে । খুব ভাজা ভুজি হবে না । সব সব ।
সুখের অভাব নেই তবু অসুখে পড়লেন শরদিন্দু বাবু । পাঁচ ছ মাস যেন পাঁচ ছটা যুগের মত মনে হচ্ছিল । মাঝে মাঝে ছেলে আর বৌমা ফোনে কথা বলে । কিন্তু সে এখন পড়ছে । স্ট্যান্ডার্ড ওয়ান হল না ? খুব পড়ার চাপ । সময় কই ?
ডাঃ গোস্বামী নিয়মিত চেক আপ করে যান । প্রেশার বাড়ছে দেখে ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে যান ।
- আরিব্বাস, সুগারটাও ধরিয়েছেন ? ডাঃ গোস্বামী বলছিলেন, আমার একটা গর্ব ছিল মশাই আপনাকে নিয়ে । এত বয়েস পর্যন্ত সুগারকে ঠেকিয়ে রাখা তো চাট্টিখানি কথা নয় । সেই আপনি কিনা … না এত রকম সিম্পটম তো হেলাফেলার বস্তু নয় ।
ডাঃ গোস্বামী সাজেস্ট করলেন, বলি কি নার্সিং হোমে একবার ভর্তি হয়ে যান । মেডিক্লেম যখন করাই আছে । ছেলে তো আপনার খুব ভাল । সব ব্যবস্থা করেই গেছে ।
নার্সিং হোমে ‘একবার’ বেড়ান হল বটে কিন্তু অসুখ গেল না । ডাঃ গোস্বামী টক খাওয়া মুখ করে প্যাডে নতুন টেস্ট লিখতে যাচ্ছেন এমন সময় ফোনটা এলো ।
- হ্যালো দাদু আমি বিল্টু বলছি । তোমার রাজপুত্র গো ।
ডাঃ গোস্বামীকে আর নতুন টেস্ট লিখতে হয় নি । কেননা ‘রাজপুত্র’ বলেছিল, আমি রোজ একবার করে ফোন করব । বাবা মা দুজনেই পারমিশন দিয়েছে ।
- অরুণ চট্টোপাধ্যায় / ২০/০৯/২০১৫
------------------------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Arun Chattopadhyay in WaaS / 20 September 2015
No comments:
Post a Comment