"); -->

Jul 4, 2015

কথা বেশি নয়


|| কথা বেশি নয় ||


কোলকাতার রাস্তায় আজকাল আর ষাঁড়দের বা গোকুলকে দেখা যায় না । আগে অফিস টাইমই হোক বা বাজারের সময়ই হোক, তারা স্ব-মহিমায় ঘুরে বেড়াতেন রাস্তা দিয়ে । কেউ কেউ তো রাস্তার উপরে আয়েস করে বসেই পড়তেন, আর রোমন্থন করতেন, রোমন্থন মানে তিনি তার সদ্য ভুক্ত খাদ্যের জাবর কাটতেন । আজ তেনাদের নিয়েই আমার এই প্রতিবেদন ।

ঘটনাটা এমন কিছু নয় । তবে ঘটনাটা ঘটিয়ে ছিল একটা ষাঁড়, বা বলা যায় একটা ষাঁড় আর তার আসর, আসর মানে তার সাঙ্গপাঙ্গরা । সে সময়ে আমার পোস্টিং ছিল বজবজে । যারা বজবজে গেছেন তারা জানেন যে বজবজ একদম গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা একটি সুন্দর জনপদ, আর এখানেই সাহেবরা কেরোসিন আর মটর গাড়ীর জন্য তেলের ব্যবসাটা শুরু করেছিল । তখন অবশ্য জায়গাটা জন-বিরলই ছিল । সাহেবরা চলে যাওয়ার পরে ভারত সরকার বুঝেছিল যে সাহেবরা তেলের ব্যবসাটাকে শহর থেকে দূরে পত্তন করে ঠিক কাজই করেছে । তাই বজবজেই রয়ে গেলো তেলের ব্যবসা, আর আমরা কালো সাহেবরা সাদা সাহেবদের অনুসরণ করে লেগে যাই সেই ব্যবসায়ের চাকরিতে । দখল করি (অবশ্য ইংরেজিতে সেটিকে বলে এল্যটমেন্ট) তাদের কোয়ার্টারগুলিকেও । সেই সুবাদেই থাকতে হয় বজবজে | কিন্তু, মনটা তো পড়ে থাকে শহরে, তাই নানান অজুহাতেই বিকেল বেলায় বেড়িয়ে পড়ি শহরের উদ্দেশ্যে ।

এমনই একদিন শহর থেকে বজবজে ফিরবার সময়ে দেখি আমাদের বাড়ী ফেরার রাস্তায় বিস্তর বড়ো লম্বা গাড়ীর সারি । বজবজ চৌমাথা থেকে একটা রাস্তা গঙ্গার দিকে চলে গেছে, আর সেটির মাথায় এখনো বিরাজ করছে ঐতিহাসিক কোমাগাতা মারু’র সমাধি, এবং তার পাশেই রেলের সাইডিং । সেটিই আমাদের সেই সময়ের গন্তব্য ছিল, কারণ সেখানেই সাহেব কোয়ার্টার । কিন্তু গাড়ী যে নড়ে না । কি হোলো ? এই রাস্তাতে তেলের লরির জন্য জ্যাম হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক । কিন্তু, সে তো দিনের বেলায় হয়ে থাকে, আর এখন তো রাত আটটা । কী হোলো, কেন ? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে গাড়ীর থেকে নামতে হয় । নামলাম, আর একটু এগিয়ে জানতে পারলাম গরুরা রেল-লাইন অবরোধ করেছে । কোথায় ? কেন ? এতো দিন তো জানতাম মানুষই রেল অবরোধ করে, নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য । কিন্তু গরুতে রেল অবরোধ ! ব্যাপারটা অভিনব তাই আমি মিসেসকে গাড়ীর চাবিটা দিয়ে দেখতে এলাম ঠিক কী হয়েছে ।

সে প্রায় এক কিলো মিটার পথ হেঁটে এসে দেখি সত্যিই একটি ষাঁড় আর তার সাথে আরও কয়েকটি বাছুর রেল-লাইনের উপরে বসে আছে । ওরা যেখানে বসে আছে সেটি আবার একটা লেবেল ক্রসিং, আর সেখানে দিয়েই আমাদের রাস্তা । কেউ সেই ষাঁড়টিকে নড়াতে গেলেই সে এমন রোষ কষায়িত নয়নে দেখছে আর হুঙ্কার ছাড়ছে যে কেউ আর তার ধারে কাছে এগোতে পারছে না । আসল খবরটা জানা গেলো এক পান দোকানির কাছে, ষাঁড় মহাশয় তার দোকানও ভেঙ্গে দিয়েছেন । তাই সে তার দুঃখের কথা জানালো, আরে স্যর বাংলা দেশের থেকে রেলের ওয়াগনে চিটেল গুড় এসেছিল । সে তো আপনিও দেখেছেন । এই ষাঁড়টা আর তার সাথের ওই বাছুর গুলি ওয়াগনের থেকে ছুঁইয়ে পড়া চিটেল গুড় (molasses) সারাটা দুপুর ধরে খেয়েছে, আর এখন মাতাল হয়ে সেই বিকেল পাঁচটার সময় থেকে তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছে । সে একাই খান দশেক দোকানঘর স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে, একজন কনস্টেবলের হাঁটু গুড়িয়ে দিয়েছে, ইত্যাদি । ধ্বংসের লিস্টে আর অনেক কিছুই ছিল ।

সবাই তটস্থ, কি করা যায় তাই নিয়ে । এমন সময়ে এক ভদ্রলোক তার গরুটিকে চরিয়ে ফিরছিলেন আমাদের কোয়ার্টারের সামনে দিয়ে । আর সে সেই অবরোধকারী ষাঁড়টার সামনে আসতেই ষাঁড়টি উঠে দাঁড়ালো হুঙ্কার ছেড়ে আর আস্তে আস্তে করে গিয়ে তার প্রেম নিবেদনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সামনের যুবতী গরুটিকে ।

ব্যস আর কী ? রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেলো এক লহমায় ।


------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Phillips Biswas in WaaS / 4 July 2015

No comments: