---------------- সোমনাথ চক্রবর্তী সংকলন – মে, ২০১৫ ----------------
।। ঋতুবদল ।।
বয়সকালে একলা মনের সুখে
দুপুর রোদে ঘুরতে শুধুই টো টো,
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলে পরে
অঝোর ধারা মাথায় নিয়ে ছোটো ।
দিনগুলো সব কোথায় গেল চলে
রোদ্দুরেতে বাজার করাই দায়,
ছাতাটা ঠিক সঙ্গে যেন থাকে
মেঘে মেঘে আকাশ যখন ছায় ।
সজল কালো ঘন বাদল দিনে
খুশির পালে লাগতো ঝোড়ো হাওয়া,
এখন শুধু গোমড়া মুখে বসে
ছেলেবেলায় হারিয়ে যেতে চাওয়া ।
এখনো তো সবই তেমনি আছে
শরৎ এলে সেজে উঠছে কাশ,
শিউলি ফোটে হলুদ বোঁটা নিয়ে
আমার চোখে ঝাপসা মাছের আঁশ ।
পুজোর দিনে ফুলের মতো মুখ
চালচিত্তির থাকতো নাকো পিছে ,
চোখের কোনে থির বিজুরি হেনে
বুকের মাঝে আবীর ঢেলে দিতে ।
তখন ছিলো হঠাৎ ভালো লাগা
গুনগুনিয়ে উঠতো বুকে সুর,
এখন শুধু স্মৃতির ভারে বাঁচা
জীবন গেছে কোথায় কতদূর !
- ০১ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। পুরানো সব দিন ।।
মোমবাতির আলোয় ডিনারের নেমন্তন্ন ছিলো কাল রাতে । বললাম, আলো আঁধারির দোলাচলে আমি নেই । এমন মূর্তিমান বেরসিকের সঙ্গী হবার ইচ্ছে কারোরই তেমন নেই দেখে আমিও নিশ্চিন্ত হলুম । সন্ধ্যে হতেই সাজুগুজু করে সবাই বেরিয়ে গেল । এক কাপ চা বানিয়ে টেবিলে বসতেই হুড়মুড়িয়ে ভিড় করে এলো পুরানো সব দিন ।
মনে পড়লো ঝলমলে বিয়েবাড়ির ধোয়া ছাদ, কলাপাতার সবুজে খুশিতে ভেসে যাচ্ছে বেগুনভাজার পানসি । এরপরে ফুলকো লুচি, চীনেবাদাম দেওয়া শাকভাজা, ছোলার ডাল, কাতলা মাছের কালিয়া । পেতলের জগ থেকে ঢালা মাটির গেলাসের জলে গোলাপফুলের মিঠে সুবাস । আর সেই মনোহর প্লাস্টিকের চাটনি, খুরিতে দই, বাহারি দরবেশ, আঙুল ডোবানো লেডিকেনি আর আইসক্রিম সন্দেশ ।
ভাড়াবাড়ি নয় পুরানো কড়িবরগা আর রঙ জ্বলা দেয়ালের ঘরে টুকটুকে নতুন বৌ । অন্য একটি ছোটো ছাদে বসেছে ভিয়েন । বিশাল কড়া থেকে ঝুড়িতে ভেজে তোলা হচ্ছে লুচি । গামছা কোমরে রান্নার ঠাকুর, তার মুখে পান । ডালডার গন্ধের সঙ্গে রজনীগন্ধার মৃদু ঘ্রাণ মিলেমিশে তৈরি হয়েছে বিয়েবাড়ির মন কেমন করা সৌরভ ।
পরিবেশন টিমে বালতি হাতে কোমর বেঁধে হৈ হৈ করে নেমে পড়েছে পাড়ার ছেলেরা । ওরাই আবার গভীর রাতে শক্ত হাতে ধরবে মেয়ের পিঁড়ি । মেয়েরা সব প্রজাপতির মতো ভিড় করেছে কনের চারপাশে । ঠাকুমার সব গল্প নাতনিকে বলা শেষ । ঝুলি ফেলে ধপধপে সাদা থান পরে হাসিমুখে বসে গল্প করছে খাটের কোনে ।
সমস্ত অনুষ্ঠানটি যেন বিঠোফেনের সিক্সথ সিম্ফনি । কোনও যন্ত্রীকেই আলাদা করে আর যেন চেনা যাচ্ছে না । কিংবা হয়তো এক ছড়া নিটোল মুক্তোমালা যার এখন সুতোগাছিটা ছিঁড়ে গিয়ে অসহায় মুক্তোগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে গেছে দূরে দূরে ছোটো ছোটো বাড়িতে আর পায়রার খোপের মতো ফ্ল্যাট গুলোর কোনে কোনে । এমনি এক অনুষ্ঠানে গেছে আমার বাড়ির লোকজন যেখানে মাপা-হাসি চাবাগান প্রাণহীন মলিন এক ভাড়াবাড়ি যা আবার পরদিন নতুন করে সাজবে অন্য কারো জন্যে ।
খুঁজে দেখি আমার জন্যে ক্যাসারোলে রাখা আছে যত্নে হাতে তৈরি দুখানি রুটি, ফ্রিজে এক পিস মাছ আর একটা রসগোল্লা ।
- ০২ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। নিজস্বী ।।
নিজস্বীতে বড়োই ছোটো ফ্রেম
খেলনাগুলো করছো শুধুই জড়ো,
বাইরে এসে একটু চেয়ে দ্যাখো
আকাশটা যে অনেক বেশি বড়ো ।
টবের গাছে ফুলের হাসি নেই
বারান্দাতে ফুটতে হবে সেই,
বুকের নীচে দুঃখ পুষে রেখে
দেখনহাসি মুখের পরে ধরো ।
ভালোবাসা যত্নে ফোটা ফুল
মনের কোনে দোলে দোদুল দুল
বাতাস বলে ফুলের কানে কানে,
ভাঙবে কবে এমনতর ভুল ।
অহংকারে সাজবো কত আর
গয়নাগুলো হলো বিষম ভার
বৃদ্ধাবাসে ধুঁকছে কারো প্রাণ,
এমন যুগে বাঁচা চমৎকার ।
- ০৩ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। জীবন যে রকম ।।
তুমি তো বিয়ের আগেই জানাতে পারতে
ভালোবাসো না তুমি স্বর্গীয় ফুল, ফুলের বাহার ।
খুব ছোট্টবেলা থেকে মা আমার
কতো নিপুণ যত্নে এই একটুখানি বাগান
বাঁচিয়ে রেখেছিলো আমার বুকের জমিতে ।
এক এক করে রোজদিন, প্রতিদিন,
নীরব মমতায় ফুটতো কতো না সুগন্ধি ফুল
ঝরে যাবার আগে আবার আরও অনেক বার,
সেই ফুলের হাসি জমতো সৃষ্টিসুখে
মায়ের চোখে, আমার মুখে, রোজ ।
এই বাগানের স্বর্গ সাজাতে সাজাতে
ক্ষয়ে চুন হয়ে গেল আমার মা,
অধিকারের হাতফোয়ারার দায় তুলে দিলো তোমাকে,
খুশিতে, অপরিসীম আদরে আর বিশ্বাসে ।
আমিও তাই কেটে দিলাম ভালোবাসার ঐ শীর্ণ খাল
গাছগুলো আর ফুলগুলোর পাশ দিয়ে তোমার হাতধোয়া জল
গানের সুরে সুরে তিরতির করে তুমি বইয়ে দেবে বলে ।
আর তুমি দেখলে না বলে সাজানো বাগানে
সূর্যমুখী ফুলগুলো লজ্জায় কেমন মাথা নিচু করে রইলো
গোলাপেরও মুখে দেখো জমা দুঃখ ।
আর আমি দেখি নিজেই তুমি দাউদাউ করে কেমন জ্বলছো,
কোমল দুটো চরণ যেন অবিরত পুঁতে যাচ্ছে
মরুভূমির ঐ আগুনঝরা বালিয়াড়িতে ।
কখনো বুঝিনি হায় ওই রাংতায় মোড়া এক বুক শূন্যতায়
এতগুলো বছর সকলকে অবাক নির্বাক করে দিয়ে
কি করে কোন যন্ত্রণায় পেরিয়ে এলে তুমি !!
- ০৫ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। প্রাচীন বটগাছ ।।
আমার বাবা আমি আর আমার ছেলেকে প্রশ্ন করা হলো, তোমাদের চোখে রোমান্টিক নায়কের রোল মডেল কে ? তিরিশ বছরের ওপার থেকে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে এলো বাবার গলা আর আমরাও সমস্বরে গেয়ে উঠলাম ..."অমিত রে !" তিনপুরুষের সংসারে এভাবেই তোমায় নিয়ে হাসিকান্নায় প্রতিদিনের বেঁচে থাকা ।
বাড়ির ছেলেটা যখন বাইরে চাকরি করতে যায়, পাঁজরাভাঙা বুকের মধ্যে আলতো ছুঁয়ে দেখেছি, তোলপাড় করা রহমতের প্রাণ! কাউকে বলিনি । রোজ রাতে শুতে যাবার আগে ছেলেবেলার আমকুড়োনো ডুবসাঁতার দেওয়া নির্ভার জীবন হাত পেতে ভিক্ষে চাই ইচ্ছেঠাকরুণের কাছে । কণ্ঠে সুর খুঁজে না পেলেও যখন তখন আনমনে তোমার গানে গুনগুনিয়ে ওঠে প্রাণ ।
দুঃখের কল্পনায় যদি চারদিক ঘন আঁধার করে আসে, আসে ক্লান্তি, তখনো সেই গানের ওপারে তোমাকে ঠিক দেখতে পাই । জ্বরে যখন বেঘোরে গা পুড়ে যায়, মমতাময়ী মায়ের আশ্রয়ের মতো তোমার রতন আসে, পাশে বসে, তার ছোট্ট শীর্ণ ঠাণ্ডা হাতটি আমার কপালে রাখে । যত্নে, আদরে, ভালোবাসায় ।
শান্তি পাই শ্যামল সুন্দর সুনিবিড় ছায়া ঘেরা আমার বাংলাদেশে যেখানে চির চেনা সেই পানাপুকুর আর ভাঙা ঘাট । সকলে মিলে ভেবেও রেখেছি সময় হলেই নবজাতকের হাতে ধরিয়ে দেবো ঠিক, তোমার সহজ পাঠ ।
আবহমান কাল ধরে এভাবেই প্রাচীন অভিজ্ঞ বটগাছের মতো অমর হয়ে আমাদের ঘরে তুমি থাকো । আর আমাদের প্রতিনিয়ত রক্ষা করো । এই প্রার্থনা ।।
- ০৬ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। পূজার মন্ত্র ।।
সুখের থালে ভাত বেড়েছো
ইলিশভাপা দিয়ে,
দুঃখ মনে দিচ্ছে উঁকি
অঝোরধারা নিয়ে ।
সুখ এনেছে মধুর রসে
পাত্রখানি ভরা,
দুঃখ বলে আমিও আছি
তোমার সহোদরা ।
এমনিধারা জীবন নদী
সাগর পানে ধায়,
গ্রীষ্ম এসে চোখ রাঙালে
শীতল বরষায় ।
মন্ত্রগুলো মনের কোনে
থাকলো পড়ে তাই,
পূজার গানে রবীন্দ্রনাথ
ফুলের সাথে চাই ।
- ০৮ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। গানে গানে তোমার পানে ।।
আকাশটাকে আঁচল বলে
ভাবতে পারো যদি,
চুলের ঢালে বইবে তবে
নাম না জানা নদী ।
চাঁদ বলেছে মাঝকপালে
সাজবে যেন টিপ,
সন্ধেবেলা তুলসীতলায়
জ্বালবে তুমি দীপ ।
বাতাস এসে তোমার কথা
শোনায় কানে কানে,
তোমার কাছে শান্তি পাবো
মনটা শুধু জানে ।
সহন করো দহন জ্বালা
সদাই হাসি থাকে,
তোমার মতো সোহাগ ভরে
কেউ কি ঘিরে রাখে ?
ধারণ করো সৃষ্টি করো
তোমার অধিকার,
সোনার মেয়ে তোমার হাতে
পরশ বিধাতার ।
- ১০ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। একা একা ।।
অনার্সের জোড়া ক্লাসে ছিলো জেএনবি'র দুমিনিটের
সুপারফাষ্ট রোলকল ।
খাতা বন্ধ করে বলতেন ...
অন্য কোনও জরুরি কাজ কি আছে কারও ?
তাহলে যাও ! এক্ষুনি যেতে পারো ।
সবার আগে হাসিমুখে বেরিয়ে যেতো আমাদের দেবকুমার,
তারপর দোর বন্ধ করে শুরু হতো নব্বই মিনিটের ননষ্টপ লেকচার ।
দেবকুমারের ভালো লাগতো ...
বাইরে খোলা আকাশের ঝলমলে রোদ এলোমেলো হাওয়া,
মেয়েদের সাথে ফষ্টিনষ্টি, কোয়ালিটি আইসক্রিমের পার্লার,
কমনরুমের ঝড় আর ফুচকার ঠেক ।
একদিন কিনে আনলো বড়বাজার থেকে তবক দেওয়া লাড্ডু,
সুজয় বললো, দেখো ঠিক, ফেরত পাবে খাতায় ।
সিগারেট থেকে নির্ভুল ধরিয়ে নিতো আরও সিগারেট,
ঠোঁট দুটো কাঠকয়লা, আঙুলে কড়া নিকোটিনের দাগ ।
আমাদের তখন শুরু হয়ে গেছে আজীবনের ইঁদুর দৌড়,
একলা বাঁচার ভয়ংকর সুন্দর পাশাখেলা ।
সেখানে দেবকুমার নেই আমরাও ওকে চাই না মোটেই,
ও থাকলো পড়ে ওর স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে, থাকুক গে ।
আমরা তো ঠিকঠাক চলেছি আলোর বৃত্তের দিকে
পাশের জনকে নিষ্ঠুর কায়দায় কনুই দিয়ে ঠেলে ঠেলে ।
একা । সঙ্গী বিহীন ।
দেবকুমারকে একদিন দেখেছি দারোয়ানের ছেলের ধুম জ্বরে
বার্লি গুলে দিতে, বাব্বা কি যত্ন ।
একদিন নাকি বাইক থেকে পড়ে হাত ভাঙলো সুজয়,
ওর মা বাবা থাকে দূর গ্রামে,
সারারাত হসপিটালে উসকোখুসকো দেবকুমার, সুজয়ের পাশে,
আমাদের নাগাল ছাড়িয়ে, বহুউউ দূরে,
নির্মল নীল জ্যোতিষ্কের মতো, একা !!
- ১১ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। হরেনবাবুর গল্প ।।
(গল্প নয়, সত্যি কথা)হরেনবাবু হারিয়ে গেলেন ...
অনাথ পাড়াবেড়ানির বিয়ে হচ্ছিল না,
বৌদির কাছে হাত পাতলেন
তোমার মানতাসাটা দাও গো ।
অমন ভারী জিনিস ভাঙিয়ে এলো রঙিন শাড়ি
গহনাগাঁটি আংটি বোতাম বরযাত্রীর খাওয়া
সাজলো বরের গাড়ি ।
দিনুখুড়ো চোখ উল্টোলো, তার ভরা সংসার
ছেলেমেয়ে বৌ বাচ্চার পথে বসার জোগাড় ।
সলিড সোনার চুড়ি খুলে দিলেন বৌদি,
হরেনবাবু খুশিতে পাগল, বললেন আবার হবে
দিনুখুড়োর বড়ছেলের মুদিখানার দোকান হলো সবে ।
এমনি আরও কতো
কতো লোকেই নানান কাজে আসতো যেতো,
রোজ দুবেলা পড়তো নতুন পাত
কতরকম মানুষ তাদের নেইকো কোনও জাত ।
মাসকাবারে দুইটি ছেলে আসতো যেতো
সারাজীবন পড়াশোনার বইখাতা আর খরচ পেতো ।
চেনাজানা মানুষ কারো কষ্ট কিছু হলে
ধার করে চোখ মুছিয়ে দিতো খুশির কোলাহলে ।
অবসরের পরে
হরেনবাবু রাখলো দেহ দুটো দিনের জ্বরে,
কাঁচের গাড়ি রইলো দোরে পড়ে ।
পড়শি রা সব কোমর বেঁধে বললো, ওরে না,
দাদা যাবে মোদের কাঁধে গাড়ি চলবে না ।
যাত্রা বহুদূর
চললো কাঁধে সবার মাঝে সঙ্গে জনগণ,
পাগল হলো ভালোবাসার বাতাস কাঁদে মন ।
- ১৬ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। চাওয়া পাওয়া ।।
থালার ওপর বসতে পারি এতোই সেটা বড়ো
অনেক বুঝে বাজার খুঁজে করেছি তাই জড়ো,
তোমার ঘরে অন্ন মাপা আমার তরে রোজ
মিথ্যে শুধু দুহাত পেতে করি সুখের খোঁজ ।
তুমিই বোঝো আমার পেটে কোনটা কতো সয়
গরগরে ঝাল জ্বালিয়ে দিলে পায়েস মায়াময়,
আমার থালা বড়ো হলেও নেবার পালা এলে
তোমার মাপা দুঃখসুখে সাজবো প্রতি পলে ।
এমনি করে জীবন ভরে তোমার পানে চাই
কথার মালা পূজার থালা কিছুতো আর নাই ।
- ১৮ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। সখি ভাবনা কাহারে বলে ।।
আজ খুব ভোরে উঠে জগদীশ চন্দ্র পড়ছিলুম । গাছের সঙ্গে কথা বলার, সুখদুঃখের গল্প করার, তাদের আনন্দবেদনা বুকের মধ্যে নেওয়ার জন্যে যে তীব্র অনুভূতি-সম্পন্ন গ্রাহক যন্ত্রগুলি উনি আবিষ্কার করেছিলেন, সেগুলির নামকরণ করেছিলেন বাংলায় । এই নিয়ে দেশেবিদেশে বিস্তর বাদানুবাদের পর ঠিক হয়, যন্ত্রের সৃষ্টিকর্তার দেওয়া নামই গৃহীত হবে । ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে'র লেখকের এই অতুলনীয় ভাষা-প্রেম এই মুহূর্তে আমাকে আপ্লুত করলো আর আজকের এই নির্মেঘ আকাশ আমার কাছে আরও বেশি করে আলোকিত হয়ে উঠলো ।
এই আকার ইকার উকার সমৃদ্ধ ভাষার অমিয় সাগরে কতো যে রত্ন সঞ্চিত আছে, এ জীবনে বুঝি তার কোনও খোঁজ বর্তমান প্রজন্ম পাবে না একথা ভাবতেই বুকের ভেতরে এক অব্যক্ত যন্ত্রণাও এখন যেন রিনরিনিয়ে বাজছে । মনে হয়, ভাগীরথীর উৎস সন্ধানের মতো বাংলা ভাষার উৎস খুঁজতে আমাদের কি আবার সংস্কৃত ভাষার কাছে যেতে হবে ? এতদিন এতো দীর্ঘ অবহেলার পর তা কি আর সম্ভব ?
- ২২ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। আকাশকুসুম ।।
ভোরের হাওয়া এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বললো, আজ মেয়ে দেখতে যাওয়ার দিন । আজকেরটা বারো নম্বর । এর আগে এগারোটি পাত্রী ক্রমান্বয়ে দেখা এবং অপছন্দ হয়েছে । আধা সরকারি অফিসের কনিষ্ঠ কেরানি থেকে সবেমাত্র ইউ. ডি হয়েছে সমর । বাবা রিটায়ার্ড এলআইসি মা প্রাইমারি স্কুল টিচার । সমরের বয়স ঊনত্রিশ, দেখতে সাধারণ কিন্তু চশমার নীচে বুদ্ধিদীপ্ত চোখে আকাশের মতো নীল রঙের স্বপ্ন । ভালোবাসে গান শুনতে সিনেমা দেখতে আর আড্ডা দিতে । মেয়ে দেখার পালা চলছে আজ প্রায় ছমাস । প্রেমের সুবাতাস সমরকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে গেছে প্রতিটি বসন্তে কিন্তু তা কোনোদিনই উত্তীর্ণ হয়নি পরবর্তী সম্ভাবনায় । ঠিক যেন সমুদ্রের জল বারে বারে এসে পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে গেছে আনমনে, ব্রেকার ভেঙে সাঁতার দেওয়া আর হয়ে ওঠে নি ।
আজ সারাদিনের রোজনামচার থেকে জাম্পকাটে আমরা এখন এসেছি সন্ধ্যাবেলায় যখন দাবদাহ জুড়িয়ে শীতল হাওয়া উঠলো আর দেখা গেলো সমর তার বাবা মা'র সঙ্গে বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে অটোয় করে চলেছে বেহালায় মেয়ে দেখতে । পরেছে ফেড জিন্স আর চাঁপাফুল রঙের স্পোর্টস গেঞ্জি । গায়ে ছড়িয়েছে হালকা ফগ স্প্রে । দেখা যাচ্ছে মেয়ের বাড়ির অবস্থা বেশ ভালো । হলঘর কার্ভ টিভি আর লেদার সোফায় সাজানো । একপাশে চকচকে বুককেসে ঝলমল করছে আধুনিক সাহিত্য, ফাঁক দিয়ে মুচকি হেসে উঁকি দিচ্ছে আল্ট্রা স্লিম চেহারার প্রিয় কবির বই । মেয়ের বাবা মা অমায়িক আর বেশ আলাপী ।
একটু পরেই কফির ট্রে হাতে মেয়েটি এলো । কবিতার বইটির মতোই স্লিম । চাপা রঙের সঙ্গে মানানসই চাঁদপানা মুখ । এসি থাকার জন্যে শ্যাম্পু করা চকচকে চুল উড়ছে না মোটে, বরং তা সামলে রেখেছে একটি বাহারি সুন্দর ক্লিপ । নিপুণ হাতে কফি পরিবেশন করার সময় মনস্থির করে ফেললো সমর । একথা সেকথার পর আসার সময় মেয়ের মা বাবাকে বললো, পরের কথাবার্তা কবে বলবেন দাদা ? বাবারও হাসিমুখ, বললো ফোনে জানাবো । বাইরে বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় সমরের
বুকের ভেতর রবিশঙ্করের সেতারের মীড় । মা ও খুব খুশি । সবাই মিলে টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের রেস্তোরাঁয় খাওয়া হলো ফিসফ্রাই আর জলযোগের দোকানে দই । হইহই করতে করতে ওরা বাড়ি ফিরলো ।
এরপর সারামাস ধরে কেনাকাটা দোকানবাজার । ঘুরে ঘুরে পায়ের সুতো ছেঁড়া । দুপুর রোদে বিখ্যাত জুয়েলারি দোকান থেকে মানানসই হার । সন্ধ্যায় গড়িয়াহাট থেকে রাশিরাশি শাড়ি কাপড়, কসমেটিকস আর তত্ত্ব সাজানোর জিনিস । ফোনে ফোনে বাবা মার কতো শত কথা । দিনস্থির হয়ে যাবার পর বাড়িভাড়া, আলো, কার্ড ছাপানো । যে সেতার বেজেছিলো মেয়ে দেখা সন্ধ্যায় তা অবিরত বাজতেই থাকে বুকের নীচে, সুখের সুরে কাছে দূরে ।
এমন একদিন দুপুরে সমর যখন অফিসে পেন্ডিং ফাইল ক্লিয়ার করতে ব্যস্ত, বেয়ারা মলয় এসে বললো, সমরদা, তোমাকে নিচে কে ডাকছে । সমর নিচে নেমে এসে দেখলো, সেই মেয়ে । আজ এই দুপুর রোদে তার চোখে সানগ্লাস, পরনে জিন্স আর টি সার্ট, সঙ্গে একটি ছেলে । ভিজিটার্স রুমে নিয়ে গেলো সমর । মেয়েটি বললো, আমাকে বিয়ে করবেন না প্লিজ কারণ এই বিয়ে হলে আপনি আমি কেউই সুখী হতে পারবো না । আমায় ক্ষমা করুন । সমর বাকরুদ্ধ । প্রতিটি শব্দের ঘায়ে পটপট করে ভেঙে গেছে তখন তার বুকের পলকা হাড় । আর আচমকা হাত ফসকে পড়ে চুরমার হয়ে গেছে সেই সুরেলা সেতার । বাবা মাকে কিভাবে কথাটা বলবে ভাবতে ভাবতে অফিস ছুটির পর মাতালের মতো বাড়ির পথে পা বাড়ায় সমর ।
- ২৩ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। ভালোবাসা ।।
ভালোবাসি শব্দটির উচ্চারণে কোনও আবহ আর তৈরি হয় না আজকাল । সকলের ক্ষেত্রেই । যেমন ধরুন আপনার আর শ্রীমতীর কথা । তিনি বরং ও জিনিস রান্নাঘরে দুটি হাতে নিঃশব্দে উপুড় করে ঢেলে দিতে পারেন টকডাল আলুপোস্তা বা মাছের ঝালে । সকালে তখন অফিস বেরোনোর সময় দেখতেন প্যান্টের পাশেই নির্ভুল সাজানো থাকতো কেমন মানানসই সার্ট আর একটু ভেবে দেখুন টিফিন-বক্সে নারকোল নাড়ুর সাথে অজান্তে রোজ মিশে থাকতো সেই অতুলনীয় অনুভব ।
আভাসে ইঙ্গিতে যত্নে, কখনো বা অবহেলায় অবিকল ফুটে ওঠে ভালোবাসার ছবি । নীরবে, অপরূপ ফ্রেমে বাঁধানো, কথায় বা কোলাহলে কখনো নয় । দুরন্ত গ্রীষ্মে অফিস-ফেরত আধপোড়ার সরবতে, সন্ধ্যাবেলার তুলসীতলায় প্রদীপ দেখানো নিবেদিতপ্রাণ দুটি হাতে বা হারানো দিনে নিশীথ রাতের নম্র সমর্পণে কিংবা গভীর জ্বরে তপ্ত কপালে আশীর্বাদের মতো শীতল ছোঁয়ায় ।
মনে করে দেখুন একদিন হয়তো অফিসে চশমা নিতে ভুলেছিলেন, উপায় না দেখে অন্যের চশমা ধার করে কাজ চালাতে গিয়ে দেখেন চশমা হাতে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সেই অনন্যা । এরপর উচ্চারণের সব প্রয়োজন ফুরোয়, পাশাপাশি বসে মনেমনে কথা বললেই সেই কথা ব্লু টুথে সুরে সুরে ঠিকঠাক বেজে ওঠে, যথাস্থানে, সারাটি জীবন ।
- ২৭ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
।। তোমার পানে ।।
তিন ফোঁটা নোনাজলে একফোঁটা হাসি
রোদেজলে চেনা ফুল ফোটে রাশি রাশি,
চাঁদের কিরণে দেখি সাগরের রূপ
কখনো থাকেনা সে তো একেবারে চুপ,
মনের বয়স হলে আঁখিও বিকল
পিছু ফিরে বসে বলে, গুচ্ছের জল!
ধীরে ধীরে তোমা পানে তরীখানি ধায়,
অতিদূর জলপথ, দিন চলে যায় ।
- ২৯ মে ২০১৫
----------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Somnath Chakraborty in WaaS / May 2015
No comments:
Post a Comment