---------------- সোমনাথ চক্রবর্তী সংকলন – এপ্রিল, ২০১৫ ----------------
|| চিঠি ||
মাস খানেক আগে আলমারির লকার হাতড়াতে গিয়ে বেরিয়ে পড়লো একটা ছোট্ট ভাঁজকরা কাগজ । মলিন, দোক্তাপাতার মতো মুচমুচে । ভুরভুরে ন্যাপথলিনের গন্ধ ভরা । একটু মোটা রুলটানা কাগজ । ঝর্ণাকলমে সাজানো ঝাপসা অক্ষর । বিয়ের প্রথম মাসে পরীক্ষার জন্যে বাপের বাড়িতে থাকা প্রেয়সীর লেখা চিঠি । নাকের খুব কাছে ধরে প্রাণপণে চেষ্টা করলুম ন্যাপথলিনের গন্ধ ছাপিয়ে সেই ফেলে আসা গোলাপি দিনের ঘ্রাণ বুকের মধ্যে ফিরে পাওয়ার ।
মনে হলো সেই উজ্জ্বল যুবক বয়সে কতোদিন এই চিঠি কোটি টাকার নোটের মতো বুকপকেটে আয়েসে ঘুরে বেড়িয়েছে । শুধু জামা বদলের সময় নতুন করে ভরে নিতাম আর ওটা সঙ্গে থাকলে অফিসের টাইপরাইটারের খুটখাট সঙ্গতের সঙ্গে গুনগুনিয়ে উঠতো যখনতখন ভালোবাসার মিষ্টি সুর । লেজার আর ফাইলের ফাঁক দিয়ে মনের মধ্যে কখনো বা ঢুকে পড়তো খুশির খোলা হাওয়া । মাতালের মতো মাঝে মাঝে অকারণে ছুঁয়ে দেখতাম সেই সুগন্ধি চিঠির ছোট্ট কাগজ ।
এখন মনে হয় আজকের টেক স্যাভি যুগে ইমেল, এসএমএস, ফেসবুক আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ঘুরে বেড়ানো ছেলেমেয়েদের স্মৃতির পাতায় হায়, কিছুই যে আর থাকবে না !
- ০৩ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| দিনলিপি ||
আধুনিক ঠাকুমারা ম্লানমুখে ঘোরফেরে
কাঁধে কোনও ঝুলি তার নেই,
মায়াভরা কতো গান চিবোনো পানের ঘ্রাণ
মনেমনে বেঁচে আছে সেই ।
রহস্যের আলোছায়া নেই আর কোনও মায়া
রোমাঞ্চও গেলো বহুদূর,
মহাভারতের কথা চিরকেলে গল্পগাথা
স্মৃতিভারে হয়েছে মেদুর ।
এলইডি আলোর নীচে ভুতেরা কেমনে বাঁচে
চলে গেছে সুদূর বিদেশ,
শিরশিরে ভয় চিনে ছোটো বুকে শিশুমনে
ঠাকুমার গান হোলো শেষ ।
নেট এসে খুলে দিলো শরীরী রহস্যগুলো
আমাদের মনে শুধু ভয়,
কচি খুকি ঠিক জানে ধর্ষণ কথার মানে
কোনোদিনই ধাক্কা দেওয়া নয় !
- ০৯ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| পালঙ্ক ||
সুধা মাসীর একমাত্র ছেলে আইআইটি ইঞ্জিনিয়ার । সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়া ঝকঝকে ছেলে যেন মায়ের চোখের মণি । মেসোমশাই কবেই গত হয়েছেন । মাসি তার সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে তিলতিল করে গড়ে তুলেছেন ছেলেকে । আসলে মাসির ভেতরে ছিলো ভালোবাসার এক ফল্গু নদী, আর কেউ কোথাও না থাকায় মহাপ্লাবনের মতো সেই ভালোবাসা ধেয়ে এলো অনিমেষের দিকে । কোনও কূলকিনারা যেন রইলো না আর ।
কিন্তু আমাদের সকলের মাথার ওপরে বসে যে শিল্পী দিনরাত তার সৃষ্টিকার্যে মশগুল তাঁর তুলনাহীন খেয়ালে অনিমেষের জীবনে এলো প্রেম । এলো এক চিকন শ্যামা তন্বী কিন্তু জাতিতে মুসলিম । জানলেন যেই, দোদমার মতো সশব্দে ফেটে পড়লেন সুধা মাসী । ভালোবাসার নদী থমকে থেমে পাথর হয়ে গেল । ঝড় বিদ্যুৎ বজ্রপাতে উৎকণ্ঠিত জীবনে সেই মেয়েকে অবশেষে যখন মেনে নিলেন সুধা মাসী, তখন তার চোখেমুখে সময়ের তীক্ষ্ণ আঁচড় আর অর্ধেক চুল রূপোলী ।
সারাদিন দেখতাম সুধা মাসী তার বাহারি পালঙ্কে বসে থাকতেন । স্বপাক আহার ছিলো তার । কতোদিন দেখেছি সুধা মাসী ঐ সুন্দর পালঙ্কে বসে রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড বাজিয়ে শুনছেন । ছেলে বৌ এর সংসারে নাক গলাতেন না মোটেই । কিন্তু বৌ এর মাকে কোনোদিনও বাড়িতে ঢুকতে দিতেন না ।
এরপর দিনের নিয়মে কেটে গেছে দিন । বহুদিন সুধা মাসীর বাড়িতে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি । একদিন সন্ধেবেলায় এক আকাশ তারা সামলে নিয়ে যখন আকাশে বেড়াতে এলো চাঁদ তখন ওপাড়া দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ সুধা মাসীর কথা খুব মনে হলো । ভাবলাম, যাই দেখে আসি, মাসী কেমন আছে ।
গিয়ে দেখি ঘরে জ্বলছে উজ্জ্বল ফ্লুরোসেন্ট । মাসী তার পাঁজরের ভেতর ভালোবাসাটুকু সামলে নিয়ে এই জীর্ণ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে আর সেই সুন্দর পালঙ্কে বসে পা দোলাচ্ছে বৌ এর মা, মানে অনিমেষের শাশুড়ি, যাকে সুধা মাসী কোনোদিন বাড়িতে ঢুকতে দেন নি । আমি চুপিচুপি পালিয়ে এসে আকাশে তাকিয়ে দেখি ফাজিলের মতো হাসছে সবজান্তা চাঁদ !
- ১০ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
।। দিনের কবিতা ।।
সূর্যি মামা রাগছে দেখো চোখ পাকিয়ে রোজ
বাজার করা বিষম ঠেলা কেউ কি রাখে খোঁজ ?
পটল চিরে যতন করে রাঁধবে তুমি মাছে
পটল চেরা নয়ন এবার ঢাকবে রঙিন কাঁচে,
সন্ধেবেলা চায়ের সাথে পাঁপরভাজা দিও
নতুন বছর আসুক, তাকে বরণ করে নিও ।
দুদণ্ড পাশে বসার কথা শোনার কেউ আছে তোমার ?
যখন আকাশ তার বিশাল কড়া উপুড় করে ঢেলে দিচ্ছে
গনগনে রোদ, তখন ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা চোখে দেবার আছে কি কেউ ?
এতো বছর ধরে চলতে থাকা পুরোনো পাঁজরার চেসিস
তার অনবরত ক্যাঁচর কোঁচর শব্দমালা শোনার ধৈর্য্য আছে কারো ?
বহুবছরের পেরিয়ে আসা তেপান্তর, ফলন্ত বাগান
চোখের জলের নাবাল জলাভূমি,
রাতবিরেতের শ্বাপদসংকুল অরণ্য ভূমি অতিক্রম করার
শিউরে ওঠা গল্প, মন দিয়ে কেউ কি শুনবে ?
তুমিও কি পারো দীর্ঘক্ষণ মুখে সেলোটেপ মেরে কান পাততে
অপরের সুখের ঘরে । একদম চুপ করে শুনতে পারো কি
বনটিয়ার ঝাপটা দেওয়া কলকাকলি ।
নিঃশব্দে প্রাণ ভরে নিতে পারো
অন্যের জীবনের বাঁকে অনাদরে আপনি বেড়ে ওঠা
তৃণগুল্মের সুঘ্রাণ ?
উপুড় হয়ে ঘর মোছার মতো যত্নে মুছে কি নিতে পারো
কারো চোখের উপত্যকার প্লাবন ?
পারিনা কিছুতেই আর শোনার চেয়ে অনেক বেশি বলার আছে
তোমার আমার সকলকার ।
পৃথিবী তাই অকারণ বয়ে চলেছে
প্রতিদিনের অর্থহীন শব্দের গার্বেজ
আর পাষাণভার ।
রোজরোজ ক্ষয়ে যাচ্ছে জীবন ।
শেষ বিদায়ের মিছিলে কেউ সামিল হচ্ছে না !
- ১১ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
।। মেয়ের চিঠি ।।
ফিজিক্স বই এর ফাঁকে ঝাউপাতায়
খেলনাবাটির পুতুলের ভাঙা হাতে,
তোমার হাতে তৈরি সেই সোনারবরণ খিচুড়ি
আর সর্ষে বাটা দেওয়া ইলিশঝালে,
রকমারি সবজির বাহারি সুক্তোয়
চাটাপোটা দুধেল পায়েসে,
পড়ার টেবিলের দ্বিতীয় ড্রয়ারে
ইন্সট্রুমেন্ট বক্সের ভেতরে,
বাথরুমের সাবানদানীতে
চিলেকোঠার ছাদে বর্ষাকালের
পুরু ভেলভেটের মতো শ্যাওলায়,
দিনেরাতে আমার খাওয়ার থালায় আর
ওয়াড় পরানো পাশবালিশে,
ইস্ত্রি করা স্কুল ড্রেসের পুরোনো ভাঁজে আর স্কিপিং দড়িতে
দুবছর আগে সানাইয়ের সুরে সুরে
ছিঁড়েখুঁড়ে টুকরো টুকরো করে
ছড়িয়ে রেখে এসেছিলাম সুগন্ধি গোলাপের পাপড়ির মতো
আমার মন ।
আজকে এই কনকনে ভোররাতে ঝলমলে লেবার রুমে
আমার শরীর থেকে ছিন্ন হওয়া
এইটুকুনি ভালোবাসার কণা,
আমার বুক ছাপিয়ে মন রাঙিয়ে
মা বলে যেই আকুল কেঁদে উঠলো মাগো
আমার মরুভূমিতে যেন কূল ছাপানো বন্যা এলো মা !
আমি সব জায়গা থেকে আমার মনের সব টুকরোগুলো খুঁটে খুঁটে
যত্নে কুড়িয়ে এনে এক্ষুনি ওকে দিয়ে দিলাম ।
এখন এই নার্সিংহোমের কাঁচের জানলায়
রক্তকমল ফুটে উঠলো আমার খুশিতে ।
পর্দার ফাঁক দিয়ে তার আভা আশীর্বাদের মতো
আমাদের মুখে এসে পড়েছে ।
আমার রিক্ত হাতে সিক্ত চোখে তোমায় প্রণাম ।
- ১৪ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| পাত্রী ||
কাল সন্ধেবেলা হঠাৎ পাড়ার অমর বাবু এসে হাজির । ছেলের জন্যে পাত্রী দেখছেন । আমাকে একটি বিজ্ঞাপন মুসাবিদা করে দিতে হবে । ওনাদের চাহিদাগুলো মোটামুটি জেনে নিয়ে গভীর রাতে তৈরি হলো বিজ্ঞাপনের টেক্সট । একটু বাদে ওনাকে সেটা দিতে যাবো । তার আগে বন্ধুদের দেখাই ...
আমাদের সংসার সেই মেয়ে চায়
হাসলেই ম্লান মেঘ দূরে সরে যায়
ভালোবাসা নিতে জানা মনটুকু যার,
চুলের দুরন্ত ঢাল কোমর ছাপায় ।
মোবাইল ছোঁয় নি যে ফেসবুকে নেই
আমাদের ঘরে এলে খুশি হবে সেই ।
- ১৬ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| WaaS এ ছ’মাস ||
আমার WaaS মেম্বারশিপের ছয়মাস পূর্ণ হলো । গতবছর অক্টোবর মাসের এমনি এক দিনে আনমনে বোতাম টিপতেই বন্ধু সুদীপ রায় এসে ভালোবেসে খুলে দিয়েছিলেন এক গন্ধর্বলোকের সিংহদুয়ার । সেই থেকে শুধু শব্দ খুঁজে খুঁজে বেলফুলের মালা গাঁথা আর ফেরি করা । পরম সুখের ফেরিওয়ালা জীবনের সেই শুরু । অবাক বিস্ময়ে দেখলাম এ এমন এক জগত যেখানে পাতায় পাতায় বন্ধুরা রোজ সাজিয়ে দেন তাদের মনের আনন্দ বেদনা । হঠাৎ খুশির ঝলক আর চোখের জলের ধারা । লেখায় আর ছবিতে । এ যেন এক নক্ষত্রখচিত নীল আকাশ । পাতা খুললেই যেখানে চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙে পড়ে ।
যে সব কথা বলার জন্যে এতদিন ব্যাকুল হতাম গুমরে উঠতাম এ বয়সে কেউ তা আমায় শুধোতো না । মনের কথা গোপনে শুকিয়ে ঝরে যেতো । নিজেদের ঢাক নিজেরা পেটানোর মতো একটা কথা এখানে না বললেই নয় । অন্যান্য অনেক গ্রুপে উঁকি দিয়ে দেখা গেলো এমন পরিশীলিত শোভন গ্রুপ আর চোখে পড়লো না । বন্ধুদের কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ এখনো আমার হয়ে ওঠে নি । জানিনা কবে হবে কিন্তু এই লেখা আর ছবির মধ্যে দিয়ে যে জানা সেতো সহজে ফুরোয় না । মনের পাতায় সে ছাপ বহুদিন থাকে । মানুষটাকে ভালো করে চেনা যায় । মুখের কথা হাওয়ায় উড়ে যায়, মনে বসে না । শেষে বন্ধু সুদীপ রায়কে আরও একবার ধন্যবাদ জানাই এক সুতোয় বর্তমানে তিন সহস্রাধিক মনকে বেঁধে রাখার এই শুভ প্রচেষ্টার জন্যে ।
- ১৮ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| দুলে উঠছে পৃথিবী ||
আমার পাড়ার একটি বাড়িতে গতরাতে একটি কন্যাসন্তান হয়েছে বলে বাড়ির গিন্নির আজ থমথমে মুখভার । ফর্সা হাঁড়িমুখে ঘনিয়ে আছে যেন আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ ।
মনে পড়ে গেলো আমার ঠাকুমাকেও তো দেখেছি আমাদের যৌথ পরিবারে মেয়ে সন্তান জন্মালে বলতো, ঐ একটা মেয়ের ঢিবি হয়েছে । কিংবা হয়তো বলতেও হতো না, ঠাকুমার মুখ দেখেই টের পাওয়া যেত । আটদিনের মাথায় আটকৌড়ে, বিধাতাপুরুষের হাতে দোয়াতকলম তুলে দেওয়া, এসব অনুষ্ঠান হতো তখন শুধু ছেলেদের বেলায় ।
সেই বিধাতাপুরুষ সৃষ্টির ভার যার হাতে তুলে দিয়েছেন, তার উল্লাস ও যন্ত্রণা একাকী অনুভব করার মন দিয়েছেন, নিজের সৃষ্টিকে মনের সবটুকু মায়ামমতা আর মাধুরী দিয়ে তিলতিল করে বড়ো করে পৃথিবীকে উপহার দেওয়ার দায়িত্ব যার হাতে নিশ্চিন্তে তুলে দিয়েছেন, তার এতো অবহেলার নির্মম প্রতিশোধ কিভাবে ফিরে আসবে আমাদের সমাজ-সংসারে সেই ভয়েই মরি ।
হে ঈশ্বর, তোমার চাঁদ ফুল পাখির মতো যে নারীকে তুমি বহু যত্নে সৃষ্টি করেছো, নিপুণ হাতে নির্জনে দিয়েছও যার ভুরুর তুলির টান, এঁকেছো লক্ষীঠাকুরের মতো টলটলে মুখ, আর কানে দিয়েছো সৃষ্টির বীজমন্ত্র তার অবহেলায় দেখো কেমন দুলে উঠছে তোমার এই সুন্দর পৃথিবী । ।
- ২০ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| কিসের এক ভয় ||
সুন্দর খাঁজ কাটা গোলগোল করলা ভাজা আর টকডাল দিয়ে ভাত খেতে খেতে কাল ভাবছিলাম আমার তো করোলা কোন ছার, মারুতি 800 ও নেই । চালাতেই যে জানিনা । মাঝে মাঝে প্রয়োজনে ছেলের গাড়িতে চড়তে হয় । আমি তো যতক্ষণ পারি এই এগারো নম্বরে চলতে চলতে হাঁটু ব্যথা করলে বাস বা অটোয় করে একদিন পৌঁছে যেতে চাই সেই অচিন গাঁয়ে ।
যেখানে কাঁঠাল গাছের গায়ে ঝুলে আছে সবুজ রঙের ফল । নিকোনো মাটির দাওয়ায় তুমি নীরবে হেসে যত্ন করে পেতে দেবে কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি । শসা আর নারকোল দিয়ে মুড়ি মেখে দেবে কাঁসার জামবাটিতে । পুকুর ঘিরে জাল পড়বে দুপুরবেলা । উঠবে চকচকে জ্যান্ত কাতলা মাছ । জিরে ফোড়ন দিয়ে হবে পাতলা ঝোল । পুরোনো শিশি থেকে বার করবে আমের আচার । কুয়োতলার ঠাণ্ডা হাওয়ায় ভেসে আসবে মন কেমন করা কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ ।
রোদ পড়লে কাজলা দিঘির জলে গা ধুয়ে এসে চুল বেঁধে উঠোনে মাদুর পেতে গান শোনাতে বসবে তুমি আর একটু পরে চাঁদ এসে উঁকি দিয়ে বলবে, কেমন আছো গো ? তখন এলোমেলো হাওয়ায় মনটাকে ফুরফুরিয়ে উড়িয়ে দিয়ে আমি বলবো, ভালোই আছি সোনা । এমনি করেই যদি দিন যায়, তো যাক না ।
এই জীবনসায়াহ্নে এসেও, নিজস্ব কক্ষপথে আবর্তিত হতে হতে পরম করুণাময়ের ওপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করার নির্দেশ থেকে যখনই বিচলিত হই, তখনই রক্তপাত যন্ত্রণা আর না জানি কিসের এক ভয় আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে । ।
- ২২ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| দুর্মূল্য এক রত্ন ||
পুলুকে মনে আছে আপনার ? মনে কি পড়ে সেই সধবার একাদশী দেখে ফেরার পথে মাঝরাতে কোলকাতা শাসন ? যার বোনের বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়ে কপর্দকহীন অপু সেই রাজনন্দিনীকে নিজেই বিয়ে করে ঘরে আনল । এই সেই অপরাজিত'র পুলু সত্যজিতের অপুর সংসারে অপুর চরিত্রের পরিপূরক হিসেবে নক্ষত্রের মতো যার উজ্জ্বল উপস্থিতি ।
অপু এমন এক বিরল মানুষ জীবনের চলার পথে একে একে যে সমস্ত মণিরত্নগুলো অসাবধানে হারিয়ে ফেলে । সেই দিদি, যার আশ্রয়ে ছোটবেলায় সে পোষা প্রাণীর মতো মাঠেঘাটে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতো, প্রাণের চেয়ে প্রিয় বাবা মা, পর্দা ছেঁড়া একলা ঘরে কুড়িয়ে পাওয়া প্রেম, এবং অবশেষে সন্তানকে পরিত্যাগ করার পর বন্ধুর ভালোবাসার হাত নির্মম খরার পরে অঝোর বৃষ্টিধারার মতো তাকে জীবনে ফিরিয়ে আনে । এমন বন্ধু কি মেলে আজকাল? বোধহয় না ।
আর ভালোবাসা শব্দটি এমনই ক্লিশে, যার উচ্চারণ ভালোবাসার জগতের মানুষের কাছে যেন কতোই না অপ্রয়োজনীয় । সেই সব মানুষ তার যত্নে আর নিষ্ঠায়, মধুর আচরণে আর নিবেদনে নির্মাণ করে ভালোবাসার মায়াবী শরীর যা হয়তো বা চিরস্থায়ী হয়, উচ্চারণের আর প্রয়োজনই হয় না ।
বন্ধুর ভালোবাসাও এমনই দুষ্প্রাপ্য আর দুর্মূল্য এক রত্ন । যে পায় সে পায়, অপু পেয়েছিলো, আমাদের কবি পান নি । শুধু তার উপস্থিতি যেন টের পেয়েছিলেন বিষ্যয়ে আর শিহরণে, জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে !
- ২৩ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| রোববার পর্ব ||
উত্তর ভারতে শীতকালে এমন ঠাণ্ডা পড়ে যা কোলকাতার মানুষ মোটে আন্দাজ করতে পারবে না । তার ওপর আবার সকাল থেকে ঘন কুয়াশায় চারদিক আঁধার করে থাকে । দিনের বেলা হেডলাইট জ্বেলে গাড়ি চালাতে হয় । মাঝে মাঝে শীতকালে যখন গুরগাঁওতে যাই ঠাণ্ডায় বুকের ভেতরটা কিরকম যেন গুরগুরিয়ে ওঠে । রাতের বেলা ঘরে রুম হিটার চালাতে হয় । ছাদের সেই ঘরে কখনো বা এক হাতের ঠকঠকানি আর এক হাত দিয়ে থামিয়ে রাখি ।
এমনি এক শনিবারের সন্ধ্যায় ঠিক হলো কাল রোববার মাংস খাওয়া হবে । সকাল থেকেই মিক্সি চালিয়ে চললো তার আয়োজন । একটু বেলায় ছেলে আর আমি বেরোলাম মাংস কিনতে । চারদিক কুয়াশা মোড়া । গায়ে মোটাসোটা জ্যাকেট আর কানমাথা ঢাকা টুপি । মাংসের দোকানের সামনে গিয়ে দেখি তারের খাঁচার মধ্যে মুরগিগুলো বলির পাঁঠার মতো ঠুকঠুক করে কাঁপছে আর গাছের গুঁড়ির ওপর চকচক করছে শান দেওয়া দা ।
কুয়াশার মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডায় আর হিমে সারা শরীরটা কেমন যেন কনকনিয়ে উঠলো । ছেলে বললো, বাবা আজ আর মাংস খাবো না । চলো পনীর কিনে বাড়ি যাই ।
- ২৬ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| মালবিকার কবিতা ||
মালবিকার মুখখানি যেন ঠিক ধোয়া পানপাতার মতো । দীঘল দুটি গভীর চোখ যেন টলটলে দীঘি । ও পড়াশোনায় খুব ভালো ছোটবেলা থেকেই । স্কুলে প্রথম দুতিন জনের মধ্যেই ঘুরেফিরে থাকে ওর রেজাল্ট । হাসলে খুব সুন্দর দেখায় ওকে কিন্তু হাসে কম । বড়ো চাপা মেয়ে । মনে ঝড় উঠলে ও খাতার কোনে দুলাইনের ছোটছোট পদ্য লেখে ।
ছোটবেলায় একবার বাবা একটা রুপোর মতো ঝলমলে ইলিশ আনলো বাজার থেকে । মালবিকা সেদিন অঙ্ক খাতার মলাটের পেছনে লিখলো,
ইলিশ মাছের রূপ
মনে বড়ই সুখ
মায়ের হাতের ভাপা
সবার হাসি মুখ ।
আবার একদিন বর্ষাকালে ছুটির দুপুরে আকাশ ঝাঁপিয়ে যখন বৃষ্টি এলো জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলো মালবিকা । খাতা খুলে তক্ষুনি চুপিচুপি লিখলো,
বৃষ্টি এলো ঝাপসা হলো মন
ইচ্ছে করে ভিজি সারাক্ষণ ।
ছোটভাইকে একদিন মা বকাবকি করলো খুব । ভাই রাগ করে ভাতের থালা ফেলে দিয়ে স্কুলে চলে গেল । ও সেদিন খাতায় লিখেছিলো,
ভাতের থালা দুহাতে যাও ঠেলে
এমনি করে শান্তি কোথাও মেলে ?
মালবিকা গ্র্যাজুয়েট হলো । প্রিয় বিষয় হলো ইকনমিক্স । ওর প্রতিমার মতো মুখ আর কোমর ছাপানো চুল । মা এসে মাঝে মাঝে পেছনে বসে যত্ন করে চুল বেঁধে দেয় । যথাসময়ে মালবিকার বিয়ের যোগাযোগ আসতে সুরু করলো । অনেক দেখাদেখির পর মা বাবার পছন্দ হলো ছেলে । বিদেশে চাকরি করে, মুঠোভরা ডলার কামায় । সম্ভ্রান্ত পরিবার । বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান । এয়ারপোর্টে সবাই এলো । বিমান যখন রানওয়ে ছাড়লো মালবিকার দীর্ঘ আঁখিপল্লব কেমন ঝাপসা হয়ে এলো । অবহেলায় পড়ে রইলো বাবা, মা, ভাই, বাড়ি, পাড়া প্রতিবেশী আপনজন সবাই । পুরোনো অঙ্ক খাতায় ছোটবেলায় লেখা পদ্য বারবার বাজতে থাকলো মনে ... ...
ভাতের থালা দুহাতে যাও ঠেলে
এমনি করে শান্তি কোথাও মেলে ?
শান্তি কোথাও মেলে ? শান্তি কোথাও মেলে ?
জানলার গা দিয়ে তখন ভেসে ভেসে যাচ্ছে পেঁজা তুলোর মতো উদাসী মেঘ !
- ২৭ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
|| এক অস্থির বচসা ||
গতকাল দ্বিপ্রহরে আহারাদির পর একটি পান মুখে দিয়া বহুপঠিত একটি রবীন্দ্র উপন্যাসে পুনরায় মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করিতেছিলাম এমন সময় অকস্মাৎ অত্যন্ত জোরে দুম দুম শব্দে সচকিত হইয়া উঠিলাম । উপন্যাসের পাত্র পাত্রীরা এই উপদ্রবে যারপরনাই বিরক্ত হইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল । বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম অদূরে একটি বাড়ির দেওয়ালে একটি গোল গর্ত করা হইতেছে । গৃহিণী কহিল উহাদের স্প্লিন এসি বসিবে । কিছুক্ষণ আগে ভ্যানে করিয়া কমপ্রেসর ব্লোয়ার ইত্যাদি আসিয়াছে ।
আমি গৃহে আসিয়া, কী আর করিব, একটি অপেক্ষাকৃত তরল বিষয়ে অবগাহন করিবার প্রয়াসে আরামকেদারায় স্থির হইয়া বসিলাম কিন্তু মন দিতে পারিলাম না । অতঃপর গৃহিণীর সহিত বর্তমান সমাজ সংস্কৃতি লইয়া খেজুরে আলোচনায় অপরাহ্ণ অতিবাহিত হইল ।
সন্ধ্যায় পাশের বাড়িতে পুনরায় কলরব শুরু হইয়াছে দেখিলাম । সে বাড়ির গৃহিণী কর্তাকে স্প্লিন এসির উপযোগিতা সম্বন্ধে অবহিত করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছে যদিও উহাদের উত্তরের জানলায় একটি উইন্ডো এসি সদর্পে শোভা পাইতেছে দেখিলাম । আলোচনা ক্রমে উচ্চগ্রামে নির্ধারিত ডেসিবেল অতিক্রম করিয়া ঝগড়ায় রূপান্তরিত হইতে লাগিল এবং ইহাতে কিঞ্চিৎ সারবস্তু আছে অনুধাবন করিয়া আমরা দুজন একটু কান পাতিবার চেষ্টা করিলাম ।
বলা হইতেছে, ওএলএক্স নামক একটি কোম্পানিতে পুরাতন এসি টি অবিলম্বে বিক্রয় করিয়া আধুনিক প্রযুক্তির একটি স্প্লিন এসি আনয়ন করা হউক । দুর্বল ও মিনমিনে পুরুষকন্ঠে পুরাতন এসির নগণ্য বিক্রয় লব্ধ অর্থ এবং বর্তমানেও ইহার অবিকৃত উপযোগিতা, নূতন এসির আকাশ ছোঁয়া দাম ইত্যাদি সম্পর্কে ধীর কথাগুলি প্রবল ঝড়ে চাপা পড়িয়া যাইতেছিল ।
বৈকালিক চায়ের সহিত চিপসের পরিবর্তে এই আলোচনাটি 'টা ' এর কাজ করিল । গভীর রাতে আধো নিদ্রায় ছোটবেলার রঙিন তালপাতার পাখার শীতল মধুর বাতাস দীর্ঘনিঃশ্বাসের মতো অতি ধীরে বহিতে লাগিল ।
অতি ভোরে দুইটি শালিক পাখির অস্থির বচসা দেখিয়া উহাদের আলোচনার বিষয় জানিবার প্রবল ইচ্ছায় কিছুক্ষণ নিষ্ফল কান পাতিয়া রহিলাম । একটি দিন শুরু হইয়া গেল ।
- ২৯ এপ্রিল ২০১৫
-----------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Somnath Chakraborty in WaaS / April 2015
No comments:
Post a Comment