|| অলৌকিক ||
আজ আপনাদের কাছে আমার জীবনের একটা ঘটনা বলব যেটা অলৌকিক কিংবা বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা করা যায় না ৷ আমি নিতান্তই আনাড়ি লেখক – আমার মনীষী বন্ধুদের কাছে তাই আগে থেকেই আমার এ অক্ষমতার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছ ৷
আমি মৃতদার – আজ থেকে পনের বছর আগে আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন ৷ যে ঘটনার কথা আপনাদের বলছি তার সূত্রপাত আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ৷ আমাদের বাড়ী সল্ট লেকে একটা সারে পাঁচ কাঠা প্লটের উপরে ৷ আমরা দুজনেই বাগান ভালবাসতাম বলে অনেকটা জমিই ছাড়া ছিল ৷ বাড়ীর পেছন দিকে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, নারকেল ইত্যাদি গাছ লাগিয়েছিলাম আর সামনের দিকে লাগিয়েছিলাম জবা, মল্লিকা, রঙ্গন, করবী, গন্ধরাজ ইত্যাদি ফুল গাছ ৷ সামনের গেটের পাশে আমার স্ত্রীর অনুরোধে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানো হয়েছিল ৷ বলা বাহুল্য গাছটা আমার স্ত্রীর খুব প্রিয় ছিল এবং উনি নিজের হাতে ওটার খুব যত্ন করতেন ৷ গাছটায় অনেকদিন কোন ফুল আসছিল না ৷ আজ থেকে আঠারো বছর আগে আকস্মিক ভবেই এতে ফুল এলো যদিও লাগানো হয়েছিল আরও চার বছর আগে ৷ আমার স্ত্রী বললেন “দেখো, গাছটাই আমার প্রাণ কারণ গাছটার সব লক্ষণই আমার মতো” ৷ এই কথাটার ব্যাখ্যা প্রয়োজন ৷ আমাদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৭৬ সালে, কিন্তু বহুদিন কোন সন্তানাদি না হওয়াতে আমরা খুব মনকষ্টে থাকতাম আর এজন্য আমাদের মধ্যে খিটিমিটি লেগেই থাকতো ৷ কিন্তু জাগতিক নিয়মে ‘চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানিসুখানি চ’ ৷ বিয়ের প্রায় চোদ্দ বছর পরে ৯০ সালে আমাদের ছেলে হয় ৷ মেয়ে আসে আরও চার বছর পরে ৷ তখন থেকে আমরা, বিশেষ করে আমার স্ত্রী খুব সুখী ছিলেন ৷ সব কাজেই তখন তার আনন্দ আর উৎসাহ ৷ গাছটার যত্নও অনেক বেড়ে গেলো ৷
কিন্তু ঈশ্বর বোধ হয় আমাদের এই সুখ ভাল চোখে দেখেন নি ৷ ১৯৯৯ সালে আমার স্ত্রী দুরারোগ্য কর্কট রোগে আক্রান্ত হলেন ৷ স্ত্রীর এই অসুখে আমি ত একেবারে বজ্রাহত ৷ একদিকে অফিস, ছেলেমেয়ের স্কুল, ডাক্তার, চিকিৎসা, সংসার সব একা হাতে সামলাতে হবে? আমার অবস্থাটা আপনারা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন ৷ তবে ভগবান সব দিকে মারে না, তাই শক্তি দিলেন – সব করতাম – ওনার খাবার পর্যন্ত নিজেই তৈরি করেছি ৷ওনার চিকিৎসার আর সেবার কোন ত্রুটি রাখলাম না ৷ বাড়ীতে আয়া/নার্স রাখলাম আর সব চেষ্টাই করলাম, এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক, দৈব কোনটাই বাদ দিলাম না ৷এর মধ্যে আমার স্ত্রীর মনে সাহস যোগাতাম ৷ উনি বলতেন গাছটা ঠিক আছে? আমি বারান্দায় গিয়ে দেখতাম আর ওনাকে আশ্বস্ত করতাম ৷ সেট মিথ্যাও নয় কারণ গাছটা সবুজ আর সতেজ ছিল ৷ কিন্তু স্ত্রীর অবস্থার অবনতি হল ৷ আমি চাকরী থেকে ছুটি নিয়ে ওনার সেবায় আরও মন দিলাম ৷ প্রায় ২৪ ঘণ্টাই ওনার পাশে থেকেছি ৷ আবার মাঝে মাঝেই স্ত্রীর অনুরোধে গাছটা দেখেও আসতাম ৷আমারও মনে বিশ্বাস জন্মেছিল যে গাছটাই ওনার প্রাণ ৷ তাই গাছটাতে ফুল দেখে মনে আশা জাগত ৷
কিন্তু মানুষ যা ভাবে তা হয় না, ঈশ্বর যা ভেবে রেখেছেন তাই হয় আমার সমস্ত আশায় জল ঢেলে ২০০০ সালের ৫ই জুলাই আমাকে আর আমার সন্তানদের কাঁদিয়ে উনি চলে গেলেন ৷ আমি দুদিন আর কোনদিকে তাকাবার অবকাশ পাই নি ৷ দুটো ছোট ছোট ছেলে মেয়েকে মানুষ করা আর ঘর বার দুটো সামলানো ৷ কিভাবে কি করব ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হবার উপক্রম ৷ এর মধ্যে হঠাৎই বারান্দায় গিয়ে গাছটার দিকে চোখ পড়লো ৷ আমি আঁতকে উঠলাম – সাতদিন আগেও যে গাছে ফুল দেখেছি আজ সে গাছের সব কটা পাতাই শুকিয়ে গেছে – গাছটাও যে নিষ্প্রাণ !
------------------------------------------------------------------------------------
Contributed by: Kesab Sanyal in WaaS / 05 August 2015
No comments:
Post a Comment